ইংল্যান্ড–ক্রোয়েশিয়া: বিশ্বকাপের সেরা লড়াইয়ের নতুন দাবিদার?

ইংল্যান্ড–ক্রোয়েশিয়া: বিশ্বকাপের সেরা লড়াইয়ের নতুন দাবিদার?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ কোনটি-এ প্রশ্ন উঠতেই পারে ডালাসে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের পর। কারণ, টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা দেখেছেন ছয় গোলের অবিশ্বাস্য নাটক, একের পর এক পাল্টা আক্রমণ, বিশ্বমানের গোলকিপিং, রেকর্ড এবং শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের দাপুটে জয়।

বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের অভিযান শুরু করেছে। তবে স্কোরলাইন দেখে ম্যাচের গল্প পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কারণ, ম্যাচজুড়ে দুবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরেছিল ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে জুড বেলিংহাম ও মার্কাস রাশফোর্ডের গোল ইংলিশদের জয় নিশ্চিত করে।

 

প্রথম ম্যাচেই টমাস টুখেলের দল এমন আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে যে অনেক ইংল্যান্ড সমর্থক ইতোমধ্যেই বিখ্যাত সেই স্লোগান আবারও গাইতে শুরু করেছেন-“ইটস কামিং হোম।”

 

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ইংল্যান্ড

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ, গতি এবং আক্রমণের ধার-সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহাম, ডেকলান রাইস, ননি মাদুয়েকে ও বুকায়ো সাকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আক্রমণভাগ ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণকে শুরু থেকেই চাপে রাখে।ম্যাচের ১২ মিনিটে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায়। তবে গোলটির পেছনে ছিল নাটকীয়তা।

 

ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদরিচ বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মাদুয়েকেকে ফাউল করেন। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পটকিক নিতে আসেন হ্যারি কেইন।

 

প্রথম শটটি ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। কিন্তু ভিএআর পরীক্ষায় দেখা যায়, শট নেওয়ার আগেই গোললাইন ছেড়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ফলে পুনরায় পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার আর ভুল করেননি কেইন। ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে।

 

বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস গড়লেন কেইন

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে টাইব্রেকার বাদে পেনাল্টি থেকে সর্বাধিক গোলদাতার তালিকায় এককভাবে শীর্ষে উঠে যান হ্যারি কেইন। বিশ্বকাপে তাঁর পেনাল্টি গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫। তিনি পেছনে ফেলেন লিওনেল মেসি, ইউসেবিও, রব রেনসেনব্রিঙ্ক এবং গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে, যাদের প্রত্যেকের ছিল ৪টি করে পেনাল্টি গোল।

 

ক্রোয়েশিয়ার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

গোল হজমের পরও ভেঙে পড়েনি ক্রোয়েশিয়া। বরং ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের ফিরে পায় তারা। ৩৬ মিনিটে মার্তিন বাতুরিনা দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক কোনাকুনি শটে সমতা ফেরান। গোলটি এতটাই নিখুঁত ছিল যে জর্ডান পিকফোর্ডের কিছুই করার ছিল না। সমতায় ফেরার পর ম্যাচের গতি আরও বেড়ে যায়। দুই দলই একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে।

 

আবার কেইন, আবার ইংল্যান্ড এগিয়ে

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার মাত্র তিন মিনিট আগে ডেকলান রাইসের নেওয়া কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন হ্যারি কেইন। ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের বড় ভুল ছিল বক্সে ইংল্যান্ড অধিনায়ককে একা ফেলে রাখা। সুযোগ পেয়ে কেইন তা কাজে লাগান। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় গ্যারি লিনেকারের পাশে জায়গা করে নেন তিনি। দুজনেরই গোল সংখ্যা এখন ১০, এবং দুজনই এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ১২ ম্যাচে।

 

বিরতির আগে আবারও সমতা

তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ইভান পেরিসিচের হেড থেকে পাওয়া বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পেতার মুসা জোরালো শটে বল জালে জড়ান। স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-২। বিরতিতে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল ম্যাচটি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।

 

টুখেলের বক্তব্য বদলে দেয় ম্যাচের চেহারা

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে এক ভিন্ন ইংল্যান্ড। পরে ম্যাচ শেষে হ্যারি কেইন জানান, বিরতিতে কোচ টমাস টুখেলের বক্তব্যই দলকে বদলে দেয়।

কেইনের ভাষায়,

“ম্যাচটা দুই অর্ধে দুই রকম হয়েছে। প্রথম অর্ধে আমরা মোটামুটি ঠিকঠাকই খেলছি। কিন্তু যেভাবে গোল হজম করেছি, তা সত্যিই হতাশাজনক। মনে হয়েছে, কিছুটা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম।”

 

তিনি আরও বলেন,

“কৃতিত্ব পাওনা কোচের। বিরতিতে তিনি আমাদের উদ্দেশে দারুণ বক্তব্য দেন। বলেছিলেন, যদি আমাদের হারতেই হয়, তবে যেন নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে হারি। দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের পারফরম্যান্সেই সেটার প্রতিফলন দেখা গেছে। আমরা পুরো শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি এবং ওরা আমাদের সেই গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি।”

 

বেলিংহামের জাদু

বিরতির পর মাত্র দুই মিনিটের মাথায় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন জুড বেলিংহাম। ৪৭ মিনিটে ডান দিক দিয়ে দারুণ গতিতে উঠে এসে কোনাকুনি শটে গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা মিডফিল্ডার। গোলটি শুধু ইংল্যান্ডকে এগিয়েই দেয়নি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও পুরোপুরি তাদের হাতে তুলে দেয়।

 

রাশফোর্ডের শেষ আঘাত

এরপর ক্রোয়েশিয়া কয়েকবার ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও ইংল্যান্ডের উচ্চগতির প্রেসিং ও সংগঠিত রক্ষণ তাদের সুযোগ দেয়নি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে বদলি হিসেবে নামা মার্কাস রাশফোর্ড চতুর্থ গোলটি করেন।

সেই গোলের পরই কার্যত ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

 

পরিসংখ্যানে ইংল্যান্ডের আধিপত্য

পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ড নিয়েছিল ২২টি শট, যার ১১টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণও বিপজ্জনক ছিল, তবে সুযোগের সংখ্যায় তারা পিছিয়ে ছিল। জর্ডান পিকফোর্ড তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে খুব কাছ থেকে নেওয়া একটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন তিনি। তবে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটে ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচের। তিনি একাই ৭টি সেভ করেন। তার একাধিক দুর্দান্ত সেভ না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।

 

শিরোপার বার্তা দিল ইংল্যান্ড

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট এনে দেয়নি, বরং পুরো টুর্নামেন্টের জন্য একটি শক্ত বার্তাও দিয়েছে। দলীয় সমন্বয়, আক্রমণভাগের ধার, মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচে ফিরে আসার মানসিকতা-সবকিছুই দেখিয়েছে ইংল্যান্ড।

 

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হ্যারি কেইনের জোড়া গোল, বেলিংহামের নেতৃত্ব, টুখেলের কৌশলগত দক্ষতা এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল দেখে অনেক বিশ্লেষকই এখন ইংল্যান্ডকে শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করছেন। ডালাসের ছয় গোলের এই থ্রিলার শুধু ইংল্যান্ডের জন্য দারুণ এক শুরু নয়, বরং বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ