হাইতিকে ৩ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপে ছন্দে ফিরল ব্রাজিল

হাইতিকে ৩ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপে ছন্দে ফিরল ব্রাজিল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর সমালোচনার তীর ছুটে আসছিল চারদিক থেকে। বিশ্বকাপের শুরুতেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল আক্রমণভাগ, মিডফিল্ডের সৃজনশীলতা এবং গোল করার সামর্থ্য নিয়ে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই সেই সব প্রশ্নের বড় একটি জবাব দিয়ে দিল সেলেসাওরা। ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ডে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করেছে কার্লো আনচেলত্তির দল।

স্কোরলাইন ৩-০ হলেও ম্যাচের চিত্র ছিল আরও বড় ব্যবধানে জয়ের। ব্রাজিলের দুটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছে, একাধিক নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং পুরো প্রথমার্ধজুড়ে হাইতির রক্ষণকে প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তারা।

 

সমালোচনার জবাব মাঠেই

মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিল ব্রাজিলের আক্রমণভাগ নিয়ে। অনেকেই বলছিলেন, দলটিতে প্রকৃত অর্থে একজন নির্ভরযোগ্য ‘নম্বর নাইন’ নেই। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন মিডফিল্ডের সৃজনশীলতা নিয়ে। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে আনচেলত্তি সেই সমালোচনার জবাব খুঁজতে একাদশে পরিবর্তন আনেন। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিলেন মাতেউস কুনিয়া।

 

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সাবেক এই ফরোয়ার্ড শুরু থেকেই আক্রমণে প্রাণসঞ্চার করেন। শুধু গোলই করেননি, তাঁর চলাফেরা, পজিশনিং এবং প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের ফাঁক খুঁজে বের করার দক্ষতা ব্রাজিলের আক্রমণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

 

‘হ্যাং টেন’ উদযাপনে আলোচনায় কুনিয়া

ম্যাচের ২৩ ও ৩৬ মিনিটে জোড়া গোল করেন কুনিয়া। গোলের পর দুবারই তিনি বিখ্যাত সার্ফিং উদযাপন ‘হ্যাং টেন’ করেন। সার্ফিং সংস্কৃতিতে ‘হ্যাং টেন’ একটি বিশেষ কৌশল, যেখানে সার্ফবোর্ডের একেবারে সামনের অংশে দাঁড়িয়ে দুই পায়ের দশটি আঙুল বোর্ডের বাইরে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। অসাধারণ ভারসাম্য, আত্মবিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই কৌশল সম্ভব নয়। কুনিয়ার উদযাপন যেন প্রতীকীভাবেই বলে দিল-বিশ্বকাপের চাপের ঢেউ সামলাতে প্রস্তুত ব্রাজিল।

 

ভিনিসিয়ুসের সৃজনশীলতায় বিধ্বস্ত হাইতির রক্ষণ

ম্যাচে গোল না পেলেও ব্রাজিলের অন্যতম সেরা পারফর্মার ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রথম গোলের সূচনাও তাঁর পা থেকেই। ২৩ মিনিটে ভিনির শট হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিড ঠেকালেও ফিরতি বলে জালে পাঠান কুনিয়া। দ্বিতীয় গোলেও ভিনিসিয়ুসের অবদান ছিল অসাধারণ। মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত থ্রু পাসে কুনিয়াকে একা পেয়ে যেতে সাহায্য করেন তিনি। সুযোগ নষ্ট করেননি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।

 

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিজের নামও স্কোরশিটে তোলেন ভিনি। লুকাস পাকেতার চমৎকার পাস থেকে হাইতির গোলরক্ষকের দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-০ করেন তিনি। পুরো ম্যাচজুড়ে ভিনিসিয়ুস শুধু উইঙ্গার হিসেবেই নয়, একজন প্লেমেকারের ভূমিকাতেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

 

মাঝমাঠে ব্রুনো-পাকেতার আধিপত্য

মরক্কো ম্যাচে মাঝমাঠে কিছুটা ছন্নছাড়া দেখালেও এবার অনেক বেশি সংগঠিত ছিল ব্রাজিল। ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতা বল নিয়ন্ত্রণ, পাস বিতরণ এবং আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ম্যাচের প্রথম দশ মিনিট কিছুটা ধীরগতির থাকলেও এরপর ধীরে ধীরে খেলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় ব্রাজিল। বিশেষ করে পাকেতার ফরোয়ার্ড লাইনে বল সরবরাহ হাইতির ডিফেন্সকে বারবার বিপদে ফেলেছে।

 

রাফিনিয়ার চোট, তবু থামেনি আক্রমণ

প্রথমার্ধের ৪০ মিনিটে ব্রাজিলের জন্য একটি দুশ্চিন্তার খবর আসে। ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন রাফিনিয়া। তাঁর পরিবর্তে মাঠে নামেন ৪০ বছর ৩২০ দিন বয়সী অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রায়ান। বয়সের হিসেবে বিশ্বকাপের অন্যতম প্রবীণ খেলোয়াড় হলেও তিনি মাঠে নেমে আক্রমণে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। রাফিনিয়ার ইনজুরি নিয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে ব্রাজিল সমর্থকরা আশা করছেন পরবর্তী ম্যাচের আগেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

 

দ্বিতীয়ার্ধে পরীক্ষামূলক ব্রাজিল

বিরতিতে ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন আনচেলত্তি। ৬৪ মিনিটে জোড়া গোলদাতা কুনিয়াকে তুলে মাঠে নামানো হয় তরুণ ফরোয়ার্ড এনদ্রিককে। তখন মাঠে একসঙ্গে ছিলেন এনদ্রিক, রায়ান, ভিনিসিয়ুস এবং গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তবে আক্রমণভাগে এত পরিবর্তনের পর আগের মতো ধার আর দেখা যায়নি। বরং কয়েকবার পাল্টা আক্রমণে হাইতি ব্রাজিলের রক্ষণে উদ্বেগ তৈরি করে।

 

হাইতির সাহসী লড়াই

স্কোরলাইন একতরফা হলেও হাইতির লড়াই প্রশংসার দাবিদার। বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা কয়েকবার গোলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল গোলরক্ষক আলিসনকে অন্তত একটি বড় সেভ করতে হয়েছে।ম্যাচে হাইতি ব্রাজিলের পোস্টে তিনটি শট রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ব্রাজিল গোলমুখে ছয়টি শট রাখে। পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের সামর্থ্যের ব্যবধান থাকলেও লড়াইয়ের মানসিকতায় পিছিয়ে ছিল না হাইতি।

 

গ্যালারিতে কিংবদন্তিদের উপস্থিতি

ফিলাডেলফিয়ার স্টেডিয়ামে প্রায় ৬৭ হাজার দর্শকের উপস্থিতি ছিল। গ্যালারির বড় অংশজুড়ে ছিল ব্রাজিল সমর্থকদের আধিপত্য। বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন ব্রাজিলের তিন বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি-কাকা, রোনালদো নাজারিও এবং রোনালদিনিও।ম্যাচের আগে রোনালদিনিওর সঙ্গে দেখা করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। অনেক সমর্থকের মতে, সেই অনুপ্রেরণাই যেন মাঠে ভিনির পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

নকআউটের পথে গুরুত্বপূর্ণ জয়

মরক্কোর বিপক্ষে পয়েন্ট হারানোর পর এই জয় ব্রাজিলের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তিন পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্যও এই ম্যাচের মূল্য অনেক। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নগুলো ব্রাজিলকে তাড়া করে ফিরছিল-গোল করবে কে, আক্রমণ সাজাবে কে, মিডফিল্ডের নেতৃত্ব দেবে কে-সেসব প্রশ্নের অন্তত আংশিক উত্তর পাওয়া গেছে এই ম্যাচে।

 

বিশ্বকাপের পথ এখনও দীর্ঘ। সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। তবে হাইতির বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগ যদি ছন্দে থাকে, তাহলে যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই তারা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আর সেই আক্রমণের নতুন মুখ হিসেবে মাতেউস কুনিয়া হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নামটি আরও জোরালোভাবে লিখে রাখার শুরুটা করে ফেললেন।


সম্পর্কিত নিউজ