{{ news.section.title }}
পরিচয়ের খোঁজে আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী
শৈশব থেকে যাদের নিজের মা–বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন, একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন তারা তার জৈবিক বাবা–মা নন। এরপর জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতে অভিভাবকের পরিচয় পরিবর্তন করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে তাকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রকৃত পরিচয়ের সন্ধানে থাকা ক্লাউডিয়া চৌধুরী এবার আইনি প্রতিকার চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
বুধবার (১৭ জুন) রাজশাহীর একটি আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী নিজেই বাদী হয়ে চিকিৎসক ডা. শিপ্রা চৌধুরী এবং তার সহযোগী হিসেবে উল্লেখিত মো. নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধভাবে পরিচয় পরিবর্তন, জোরপূর্বক হলফনামা সম্পাদন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হযরত আলী সাংবাদিকদের জানান, আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, শৈশবে ক্লাউডিয়াকে অজ্ঞাত একটি স্থান থেকে এনে ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজের সন্তান পরিচয়ে লালন-পালন করেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বৈধ অভিভাবকত্ব গ্রহণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাউডিয়ার জন্মনিবন্ধন, টিকাদান কার্ড, নাগরিকত্ব সনদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি, এসএসসি পরীক্ষার নিবন্ধন ও প্রবেশপত্রসহ বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্রে ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে তার বাবা-মা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে ২০২৩ সালে হঠাৎ করে ক্লাউডিয়ার জন্মনিবন্ধনে উল্লেখিত বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করে মো. বাবুল ও মোসা. টগরী বেগমের নাম সংযুক্ত করা হয়। ক্লাউডিয়ার দাবি, তিনি ওই ব্যক্তিদের কখনো দেখেননি এবং তাদের সঙ্গে তার কোনো পরিচয়ও ছিল না।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুনে তাকে জোর করে আদালতে নিয়ে গিয়ে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করানো হয়। পরদিন তাকে জানানো হয় যে, যাদের তিনি এতদিন বাবা-মা হিসেবে জেনে এসেছেন, তারা তার জৈবিক অভিভাবক নন। অভিযোগ অনুযায়ী, এর পর তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, তার পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথিপত্র ফেরত দেওয়া হয়নি। পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তি, কলেজে ভর্তি এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে তাকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। এসব কারণে তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে জন্মনিবন্ধন করার সময় ক্লাউডিয়ার নাম, জন্মতারিখ এবং বাবা-মায়ের পরিচয় সম্পর্কে ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে আবার নতুন তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি শিক্ষাবোর্ডের নথি, এসএসসি পরীক্ষার নিবন্ধন ও প্রবেশপত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব সংশোধন ক্লাউডিয়ার অজান্তে এবং তার সম্মতি ছাড়া করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হযরত আলী বলেন, ক্লাউডিয়ার পাসপোর্টও কথিতভাবে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও জানান, নিজের প্রকৃত জন্মপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের অভাবে ক্লাউডিয়া দীর্ঘদিন ধরে গভীর মানসিক অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যে রয়েছেন।
আইনজীবী হযরত আলীর ভাষ্য, একজন ব্যক্তি যখন নিজের প্রকৃত বাবা-মা ও জন্মপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানেন না, তখন তা তার মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তার দাবি, ক্লাউডিয়া বর্তমানে পরিচয়সংকট, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বাদীপক্ষ আরও জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে ক্লাউডিয়ার বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।
মামলায় আপাতত দুইজনকে আসামি করা হলেও তদন্তে অন্য কোনো ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করবে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন বলে জানা গেছে। এর আগে এ বিষয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিতেও তিনি অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
একটি ব্যক্তিগত বিরোধ বা মামলার সীমা ছাড়িয়ে ঘটনাটি এখন পরিচয়, মানবাধিকার এবং প্রশাসনিক ও আইনি স্বচ্ছতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা আদালতের নির্দেশে চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।