জবিতে অপারেশন সার্চলাইট ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত

জবিতে অপারেশন সার্চলাইট ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ‘অপারেশন সার্চলাইট ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা: ইতিহাসের প্রামাণ্য আখ্যানের সন্ধানে’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের যৌথ আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

 

সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান। তিনি তাঁর বক্তব্যে সঠিক ইতিহাসচর্চা, রাষ্ট্রীয় বয়ান এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত কেবল একটি সামরিক অভিযানের সূচনা নয়; ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার একটি সুপরিকল্পিত দমন-পীড়ন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা বোঝার জন্য ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি এর গভীর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি প্রামাণ্য ইতিহাস রচনায় বহুমাত্রিক উৎস, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং সমকালীন দলিলের সমন্বিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি ইতিহাসবিদদের নতুন করে প্রশ্ন তোলা এবং তথ্যনির্ভর গবেষণার মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

 

তিনি বলেন, ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়, তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গণহত্যার শামিল। তবে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ দলিলীকরণ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে যথাযথভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের অবশ্যম্ভাবী সংগ্রাম, এবং ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সেই সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধকে অনিবার্য করে তোলে।

 

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্‌দীন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, স্বাধীনতার ৫৬ বছর হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ও নির্ভুল ইতিহাস এখনো রচিত হয়নি, যা জাতির জন্য এক বড় কলঙ্ক। তিনি উল্লেখ করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে আপামর বাঙালির পাশাপাশি পুলিশ, আনসার ও ইপিআর সদস্যদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তবে স্বাধীনতার এত বছর পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেন ইতিহাস রচনায় নির্মোহ হতে পারেননি—তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।


উপাচার্য আরও বলেন, মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস পরিহার করে বাস্তবভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস সামনে নিয়ে আসতে হবে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এখনো মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সঠিক সংখ্যা কিংবা শহিদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো সুসংহতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতে একটি সমন্বিত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি ও ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা থেকে মুক্তির আহ্বান জানান।

 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন। মূল বক্তব্যের ওপর আলোচনায় অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স পরিচালক অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ।

 

অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হলে প্রাথমিক সাক্ষ্য ও নির্ভরযোগ্য উৎসের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইতিহাসের যাত্রা কখনো থেমে থাকে না উল্লেখ করে তিনি শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট স্থান সংরক্ষণের ওপর জোর দেন।

 

অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-কে একটি পরিকল্পিত ও প্রতারণামূলক হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি শাসকদের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন।

 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি, যা একটি বড় সীমাবদ্ধতা। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হলে আজ সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ সহজ হতো। তিনি একটি নির্মোহ ইতিহাস প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

 

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ড. মোঃ আনিসুর রহমান। সেমিনারের শেষে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকবৃন্দ অংশগ্রহণে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

 


সম্পর্কিত নিউজ