{{ news.section.title }}
সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের আদেশ
বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত এই মৃত্যুরহস্য উন্মোচনের লক্ষ্যে তাঁর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় সুরতহাল প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্তের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। নতুন এই পদক্ষেপকে মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি বুধবার (১০ জুন) নিশ্চিত করে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মরদেহ উত্তোলনের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক, আইনি ও কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করা হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ বলেন, হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের স্বার্থে আদালতের কাছে মরদেহ উত্তোলন, পুনরায় সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং ময়নাতদন্তের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এখন সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্য, সাক্ষ্য ও আলামত যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে নতুন করে ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর আদালতে জানান যে, তিনি তার বোন নিলুফা জামান চৌধুরী নীলা চৌধুরীর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে নীলা চৌধুরী, তার স্বামী কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজায় অবস্থিত সালমান শাহর বাসায় যান।
সেখানে উপস্থিত হয়ে তারা সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক এবং গৃহকর্মী আবুলের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, সালমান শাহ ঘুমিয়ে আছেন। পরে তারা নিজেদের বাসায় ফিরে যান। কিন্তু কিছু সময় পর সালমান শাহর বাসা থেকে ফোন করে দ্রুত আসার জন্য বলা হয়। ফোনে জানানো হয়, সালমান শাহর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।
খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পান, সালমান শাহ নিজের শয়নকক্ষের খাটের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। এরপর তাকে দ্রুত রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর একই দিন রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। তবে শুরু থেকেই সালমান শাহর মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড-এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরিবারের একাংশ, ভক্ত-অনুরাগী এবং চলচ্চিত্রাঙ্গনের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এ মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সালমান শাহ, যার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, নব্বইয়ের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন ছিলেন। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই তিনি অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং দেশের চলচ্চিত্রে আধুনিকতার নতুন ধারা সূচনা করেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু গোটা দেশের দর্শক ও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক শোক ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত বছরের ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, চলচ্চিত্র অভিনেতা ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদসহ মোট ১৭ জন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রায় ৩০ বছর পর মরদেহ উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। যদিও এত দীর্ঘ সময় পর ফরেনসিকভাবে কী ধরনের তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তবুও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সালমান শাহর ভক্ত-অনুরাগী, চলচ্চিত্রাঙ্গনের ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এখন আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পর তদন্ত কোন দিকে অগ্রসর হয় এবং বহু বছরের পুরোনো এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই সবার নজর।