{{ news.section.title }}
চীনই আমাকে গড়ে তুলেছে : জ্যাকি চ্যান
বিশ্বখ্যাত অ্যাকশন তারকা, মার্শাল আর্টস কিংবদন্তি এবং এশীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব জ্যাকি চ্যান সম্প্রতি নিজের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন ও অপূর্ণ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন নয়; বরং চীনা চলচ্চিত্র, চীনা সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক আবেগঘন পোস্টে ৭১ বছর বয়সী এই অভিনেতা নিজের অতীতের স্মৃতিচারণ করেন। সেখানে তিনি চীনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তোলা কয়েকটি পুরোনো ছবি শেয়ার করেন। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০০৪ সালে বেইজিংয়ের মহাপ্রাচীর, ২০১০ সালের সাংহাই ওয়ার্ল্ড এক্সপো এবং ২০১৯ সালে শানশি প্রদেশে তোলা কিছু মুহূর্ত।
ছবিগুলোর সঙ্গে দেওয়া বার্তায় জ্যাকি চ্যান লিখেছেন, পুরোনো ছবিগুলো দেখলে আজও তিনি সেই সময়ের ক্লান্তি, উত্তেজনা, সংগ্রাম এবং শুটিং সেটে কাটানো তারুণ্যের দিনগুলোর শক্তি অনুভব করতে পারেন। তার মতে, এসব স্মৃতি তাকে মনে করিয়ে দেয় কত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।
জ্যাকি চ্যান বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং কাজ করার সুযোগ তার হয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ তাকে ভালোবেসে ‘জ্যাকি’ নামে ডাকেন। তবে এই আন্তর্জাতিক পরিচয়ের পেছনে যে চীনা সংস্কৃতি, চীনা চলচ্চিত্র এবং তার জন্মভূমির অবদান রয়েছে, তা তিনি কখনো ভুলে যাননি।
তিনি বলেন, “চলচ্চিত্র আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু আমি সবসময় মনে রাখি আমার শুরুটা কোথায় হয়েছিল। চীনই আমাকে গড়ে তুলেছে।”
ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজের তিনটি বড় স্বপ্নের কথাও প্রকাশ করেন এই তারকা। প্রথমত, তিনি চেয়েছিলেন চীনা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তুলতে। দ্বিতীয়ত, তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বের দর্শক যেন চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজকে গুরুত্ব দেয় এবং তাদের প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেয়। তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যেখানে তারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
জ্যাকি চ্যানের দীর্ঘ ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন; বরং চীনা চলচ্চিত্র শিল্পের এক বৈশ্বিক দূত। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৮০-এর দশকে হংকং সিনেমার উত্থানের সময় তিনি অ্যাকশন চলচ্চিত্রে নতুন ধারা তৈরি করেন। তার অভিনীত Drunken Master, Police Story, Project A, Armour of God এবং Rumble in the Bronx আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
পরবর্তীতে হলিউডে Rush Hour, Shanghai Noon, The Tuxedo, The Karate Kid এবং Kung Fu Panda সিরিজের মতো সফল প্রজেক্টের মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের দর্শকদের কাছেও ব্যাপক পরিচিতি পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্যাকি চ্যান ছিলেন প্রথম এশীয় তারকাদের একজন, যিনি পূর্ব ও পশ্চিমের বিনোদন শিল্পের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে সক্ষম হন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও জ্যাকি চ্যান বহুবার বলেছেন, তিনি সবসময় নিজেকে চীনা সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন। তার বিশ্বাস, সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মূল্যবোধকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার শক্তিশালী উপায়।
তিনি আরও বলেন, তারকা হওয়ার বহু আগেই দয়া, কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং আন্তরিকতার মতো মূল্যবোধ তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে গিয়েছিল। এই মূল্যবোধগুলোই তাকে কঠিন সময় অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
জ্যাকি চ্যান বর্তমানে চলচ্চিত্রে আগের তুলনায় কম কাজ করলেও এখনও সক্রিয় রয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। বিশেষ করে তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া এবং চীনা চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখাকে তিনি নিজের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন।
তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে তার আরেকটি নতুন ইচ্ছা যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্যাকি চ্যান। তিনি চান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ যেন চীনে ভ্রমণ করেন, দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে দেখেন।
তার ভাষায়, চীন শুধু একটি দেশ নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, অসংখ্য গল্প এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ যদি নিজ চোখে চীনকে দেখার সুযোগ পায়, তাহলে দেশটিকে তারা আরও গভীরভাবে বুঝতে পারবে।
বিশ্বজুড়ে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে অ্যাকশন সিনেমার প্রতীক হয়ে ওঠা জ্যাকি চ্যানের এই বক্তব্যে তাই শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত অনুভূতিই নয়, বরং নিজের দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ৭১ বছর বয়সেও তিনি নতুন স্বপ্ন দেখছেন, আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন, চীনা সংস্কৃতি এবং আগামী দিনের চলচ্চিত্র জগৎ।