{{ news.section.title }}
আপনার রক্তশূন্যতা হলে কীভাবে বুঝবেন
রক্তশূন্যতা বলতে রক্তের হিমোগ্লোবিন নামক রঞ্জক পদার্থের স্বল্পতাকে বুঝি। বয়স ও লিঙ্গভেদে এই হিমোগ্লোবিন যখন কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে থাকে, তখন বলা হয় অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা। হিমোগ্লোবিন শরীরের গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে।
রক্তে যখন হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়, তখন তাকে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া বলা হয়। শরীরে রক্তের অভাব হচ্ছে কি না, তা মূলত কিছু শারীরিক লক্ষণ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়।
শারীরিক লক্ষণসমূহ
রক্তশূন্যতা হলে শরীরের কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সারাক্ষণ শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা কোনো কারণ ছাড়াই ক্লান্তি বোধ করা অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
ফ্যাকাশে ভাব: চেহারা, চোখ, জিহ্বা এবং নখ ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যায়। চোখের নিচের পাতা টেনে ধরলে ভেতরের অংশটি যদি ফ্যাকাসে দেখায়, তবে তা রক্তশূন্যতার ইঙ্গিত দেয়।
শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড়: অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে শ্বাসকষ্ট হওয়া বা হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা।
মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথা: শরীর দুর্বল হওয়ার কারণে ঘনঘন মাথা ঘোরে এবং মাথাব্যথা হতে পারে।
ক্ষুধামন্দা ও রুচিহীনতা: খাবার খেতে ইচ্ছে না করা বা রুচি কমে যাওয়া。
অখাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা: কারো কারো ক্ষেত্রে মাটি, কয়লা বা বরফ খাওয়ার অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়।
নখ ও চুলের সমস্যা: নখ পাতলা হয়ে ফেটে যাওয়া (spoon nail) এবং চুলের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া।
কিভাবে নিশ্চিত হবেন?
কেবল লক্ষণ দেখে রক্তশূন্যতা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এটি নিশ্চিত হতে চিকিৎসকরা সাধারণত সিবিসি (CBC - Complete Blood Count) পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে হিমোগ্লোবিনের সঠিক মাত্রা জানা যায়।
স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিনের মাত্রা:
পুরুষ: ১৩.৮ থেকে ১৭.২ গ্রাম/ডেসিলিটার।
মহিলা: ১২.১ থেকে ১৫.১ গ্রাম/ডেসিলিটার।
শিশু: ১১ থেকে ১৬ গ্রাম/ডেসিলিটার।
রক্তশূন্যতা শনাক্ত হলে কেবল আয়রন বড়ি না খেয়ে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ এটি অন্য কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে।
অ্যানিমিয়া কোন ভিটামিনের অভাবে হয়
অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা মূলত ভিটামিন বি১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের অভাবে হয়। এছাড়াও, আয়রন, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন (পিরিডক্সিন)-এর ঘাটতিও রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত করে অ্যানিমিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
মূল কারণসমূহ:
ভিটামিন (কোবালামিন): লোহিত রক্তকণিকা তৈরির জন্য অপরিহার্য। এর অভাবে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়।
ভিটামিন (ফলিক অ্যাসিড): ডিএনএ সংশ্লেষণ এবং নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে।
আয়রন (Iron): যদিও এটি ভিটামিন নয়, তবুও আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়ে সবচেয়ে সাধারণ 'আয়রন ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া' হয়।
ভিটামিন (পিরিডক্সিন): হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সহায়তা করে।
লক্ষণ:
ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক, শ্বাসকষ্ট এবং মাথা ঘোরা।
রক্তশূন্যতা দূর করার উপায়
রক্তশূন্যতা দূর করার প্রধান উপায় হলো খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা এবং কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদান হলো আয়রন। এটি দুই ধরণের উৎস থেকে পাওয়া যায়:
প্রাণিজ উৎস (সহজে শোষিত হয়): কলিজা (মুরগি বা গরু), লাল মাংস (গরু বা খাসি), ডিমের কুসুম এবং সামুদ্রিক মাছ।
উদ্ভিজ্জ উৎস: পালং শাক, কচু শাক, লাল শাক, মসুর ডাল, ছোলা, কিশমিশ, খেজুর এবং বাদাম।
২. ভিটামিন সি-এর সঠিক ব্যবহার
শুধুমাত্র আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেলেই হবে না, শরীর যাতে সেই আয়রন শোষণ করতে পারে সেজন্য ভিটামিন সি প্রয়োজন।
খাবারের সাথে বা পরে কমলা, লেবু, আমলকী বা পেয়ারা জাতীয় ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৩. ভিটামিন বি১২ এবং ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার
লোহিত রক্তকণিকা গঠনে এই দুটি ভিটামিন অপরিহার্য:
ভিটামিন বি১২: দুধ, পনির, দই, মাছ এবং মাংসে প্রচুর পাওয়া যায়। নিরামিষাশীদের জন্য ফরটিফাইড সিরিয়াল বা সয়াবিন দুধ কার্যকর হতে পারে।
ফলিক অ্যাসিড: সবুজ শাকসবজি, ব্রকলি, বিট, এবং মটরশুঁটিতে পাওয়া যায়।
৪. প্রাকৃতিক জুস ও ঘরোয়া সমাধান
দ্রুত রক্ত বৃদ্ধিতে কিছু ঘরোয়া পানীয় কার্যকর হতে পারে:
বিট ও গাজরের জুস: আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর।
ডালিমের রস: এটি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে অত্যন্ত সহায়ক।
লোহার পাত্রে রান্না: লোহার কড়াই বা পাত্রে রান্না করলে খাবারের আয়রনের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
৫. যা এড়িয়ে চলবেন
ক্যাফেইন: খাবার খাওয়ার ঠিক আগে বা পরে চা বা কফি খাবেন না, কারণ এটি আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট: আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের সাথে ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার বা ওষুধ এড়িয়ে চলুন।
সতর্কতা: যদি ক্লান্তি বা দুর্বলতা খুব বেশি হয়, তবে নিজে কোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে অবশ্যই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন।