{{ news.section.title }}
হিট স্ট্রোক নাকি ডিহাইড্রেশন, গরমে কোন লক্ষণে কী করবেন?
প্রচণ্ড গরমে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে দুপুরের রোদে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে, পর্যাপ্ত পানি না খেলে কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হলে হিট স্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দুটি সমস্যার কিছু লক্ষণ কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারেন না, শরীরের অস্বস্তি হিট স্ট্রোকের কারণে হচ্ছে, নাকি পানিশূন্যতার কারণে। কিন্তু এ দুটির মধ্যে পার্থক্য জানা জরুরি, কারণ হিট স্ট্রোক প্রাণঘাতী হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা দরকার হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রচণ্ড গরমে শরীর ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা, নিয়মিত পানি পান করা, ঠান্ডা পানিতে গোসল বা শরীর ভেজানো এবং বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার। সংস্থাটি গরমে নিয়মিত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে-প্রতি ঘণ্টায় অন্তত এক কাপ পানি এবং দিনে সাধারণভাবে ২–৩ লিটার পর্যন্ত পানি প্রয়োজন হতে পারে, তবে ব্যক্তির বয়স, কাজ, ঘাম ও রোগভেদে চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
হিট স্ট্রোক কী
হিট স্ট্রোক হলো তীব্র গরমে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার গুরুতর অবস্থা। স্বাভাবিকভাবে শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা, রোদে কাজ, পানির ঘাটতি বা দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে থাকার কারণে শরীর আর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে না। তখন শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়।
মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, কারও হিট স্ট্রোক হয়েছে মনে হলে তা জরুরি চিকিৎসার বিষয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ছায়া বা ঠান্ডা জায়গায় নিতে হবে, অতিরিক্ত পোশাক খুলে দিতে হবে এবং চিকিৎসা সহায়তা আসা পর্যন্ত শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে হবে।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
হিট স্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা বেশি হতে পারে। এ সময় মাথা ঘোরা, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, পেশিতে খিঁচুনি, দ্রুত ও শক্তিশালী পালস এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সিডিসি হিট স্ট্রোকের লক্ষণ হিসেবে উচ্চ শরীরের তাপমাত্রা, গরম-লাল-শুষ্ক বা ভেজা ত্বক, দ্রুত শক্তিশালী নাড়ি, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, বিভ্রান্তি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।
হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হলো মানসিক অবস্থার পরিবর্তন। কেউ যদি গরমে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, অস্বাভাবিক আচরণ করে, কথা জড়িয়ে যায়, খিঁচুনি হয় বা অজ্ঞান হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সিডিসির হিট-ইলনেস নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, altered mental state বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হিট স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা দরকার।
ডিহাইড্রেশন কী
ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হয় যখন শরীর যত পানি হারায়, তার তুলনায় পর্যাপ্ত পানি পায় না। গরমে ঘাম বেশি হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বা ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন বা উপযুক্ত পানীয় না খেলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে। হালকা থেকে মাঝারি ডিহাইড্রেশনে পানি বা তরল গ্রহণে ধীরে ধীরে উন্নতি হয়। তবে মারাত্মক ডিহাইড্রেশন হলে চিকিৎসা প্রয়োজন। মায়ো ক্লিনিক বলছে, mild to moderate dehydration সাধারণত বেশি তরল পান করলে ঠিক হয়, কিন্তু severe dehydration হলে দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
ডিহাইড্রেশন হলে কীভাবে বুঝবেন
ডিহাইড্রেশনের ক্ষেত্রে শরীর সবসময় খুব বেশি গরম হবে এমন নয়। বরং মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ঠোঁট শুকিয়ে ফাটা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া, পেশিতে টান ধরা, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ঘাম, তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা এবং প্রস্রাব কমে যাওয়া তাপজনিত পানিশূন্যতা বা heat exhaustion-এর সঙ্গে দেখা যেতে পারে। ডিহাইড্রেশন বেশি হলে রোগী খুব দুর্বল হয়ে যেতে পারে, দাঁড়ালে মাথা ঘুরতে পারে, মুখ-জিহ্বা শুকিয়ে যেতে পারে এবং চোখ বসে যেতে পারে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, কিডনি বা হৃদ্রোগী এবং যারা বাইরে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি বেশি।
হিট স্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনের পার্থক্য
হিট স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং মানসিক বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে ডিহাইড্রেশনে মূল সমস্যা হলো শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি। এতে তৃষ্ণা, মুখ শুকানো, প্রস্রাব কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা বেশি দেখা যায়।
ডিহাইড্রেশন অনেক সময় হিট এক্সহস্টশন বা তাপজনিত অবসাদে রূপ নিতে পারে। আর যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে সেটি হিট স্ট্রোকের দিকে যেতে পারে। তাই গরমে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, পেশিতে খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
হিট স্ট্রোক হলে কী করবেন
হিট স্ট্রোক সন্দেহ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। রোগীকে ছায়া, ঠান্ডা ঘর বা বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পোশাক খুলে বা আলগা করে দিতে হবে। ঘাড়, বগল, কুঁচকি ও মাথায় ঠান্ডা ভেজা কাপড় বা বরফ প্যাক দেওয়া যেতে পারে। শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে ফ্যানের বাতাস দেওয়া, স্পঞ্জিং করা বা ঠান্ডা পানিতে গোসল করানোও কার্যকর হতে পারে। মায়ো ক্লিনিক হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ঠান্ডা পানিতে রাখা, ঠান্ডা পানি ছিটানো, ভেজা কাপড়/বরফ প্যাক ঘাড়-বগল-কুঁচকিতে দেওয়া এবং সচেতন থাকলে ক্যাফেইনবিহীন ঠান্ডা পানীয় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
রোগী অচেতন হলে মুখে পানি ঢোকানোর চেষ্টা করা যাবে না। খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া, পান করতে না পারা বা শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। মায়ো ক্লিনিকের হিট এক্সহস্টশন নির্দেশনাতেও অজ্ঞান হওয়া, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, পান করতে না পারা বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে জরুরি চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে।
ডিহাইড্রেশন হলে কী করবেন
ডিহাইড্রেশন হলে প্রথম কাজ হলো শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া এবং তরল ফিরিয়ে দেওয়া। রোগীকে ছায়ায় বসান বা শুইয়ে দিন। অল্প অল্প করে বারবার পানি, ওরস্যালাইন, লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় দেওয়া যেতে পারে। একসঙ্গে অনেক পানি না খাইয়ে ধীরে ধীরে পান করানো ভালো। বমি হলে, প্রস্রাব খুব কমে গেলে, মাথা ঘোরা না কমলে বা রোগী দুর্বল হয়ে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জনস হপকিন্স মেডিসিনের পরামর্শ অনুযায়ী, রোদে কাজ বা খেলাধুলার সময় পর্যাপ্ত তরল পান করতে হবে, শরীর যত তরল হারাচ্ছে তার চেয়ে বেশি তরল গ্রহণ করতে হবে এবং সম্ভব হলে দিনের ঠান্ডা সময়গুলোতে বাইরের কাজ রাখা ভালো। ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে উপযুক্ত পানীয়ও সহায়ক হতে পারে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
গরমে কারও শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে, অজ্ঞান হয়ে গেলে, বিভ্রান্তি দেখা দিলে, খিঁচুনি হলে, শ্বাসকষ্ট হলে, বমি বন্ধ না হলে, প্রস্রাব একেবারে কমে গেলে অথবা পান করতে না পারলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। হিট স্ট্রোকের চিকিৎসায় দেরি হলে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গরমে কীভাবে সতর্ক থাকবেন
গরমে দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা ভালো। বাইরে বের হলে ঢিলেঢালা, হালকা রঙের কাপড় পরুন। সঙ্গে পানি রাখুন, ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার করুন, সানগ্লাস পরুন এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা রোদে থাকবেন না। ভারী কাজ সকাল বা বিকেলে করার চেষ্টা করুন। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, অসুস্থ ব্যক্তি এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের নিয়মিত পানি পান, বিশ্রাম ও ছায়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এনএইচএস হিট এক্সহস্টশনের ক্ষেত্রে ঠান্ডা জায়গায় নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় পোশাক খুলে দেওয়া, রিহাইড্রেশন পানীয় বা ঠান্ডা পানি দেওয়া এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে ত্বক ঠান্ডা করার পরামর্শ দিয়েছে।
সূত্র: সিডিসি, ডব্লিউএইচও