কোন রক্তের গ্রুপে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি?

কোন রক্তের গ্রুপে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

স্ট্রোক সাধারণত হঠাৎ ঘটে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী বা দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল ও হৃদ্‌রোগ-এসব স্ট্রোকের পরিচিত ঝুঁকি। তবে সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, রক্তের গ্রুপও কম বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজির পিয়ার-রিভিউ জার্নাল Neurology-তে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বছরের নিচে যাদের রক্তের গ্রুপ ‘এ’, তাদের ইস্কেমিক স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্য রক্তের গ্রুপের মানুষের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। ইস্কেমিক স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে হওয়া স্ট্রোক।

 

গবেষণাটি ছিল একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিস। এতে তরুণ বা কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ইস্কেমিক স্ট্রোক নিয়ে করা বিভিন্ন জিনগত গবেষণার তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা হয়। আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজির তথ্য অনুযায়ী, গবেষণায় প্রায় ১৭ হাজার স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তি এবং প্রায় ৬ লাখ স্ট্রোকমুক্ত ব্যক্তির তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে। গবেষকেরা ৪৮টি জিনগত গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, রক্তের গ্রুপ নির্ধারণকারী জিনগত অংশের সঙ্গে কম বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকির একটি সম্পর্ক থাকতে পারে।

 

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রুপের ব্যক্তিদের কম বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্য রক্তের গ্রুপের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ‘ও’ গ্রুপের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি প্রায় ১২ শতাংশ কম দেখা গেছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই ফলাফল দেখে ‘এ’ গ্রুপের মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি আপেক্ষিক ঝুঁকি; এটি মানে নয় যে ‘এ’ গ্রুপের সবার স্ট্রোক হবে। বরং এটি একটি সম্ভাব্য জিনগত সম্পর্ক, যা আরও গবেষণার দাবি রাখে।

 

গবেষণার অন্যতম লেখক ও নিউরোলজিস্ট স্টিভেন কিটনার বলেন, কেন রক্তের গ্রুপ ‘এ’ কম বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে গবেষকদের ধারণা, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা, প্লেটলেটের কার্যকারিতা, রক্তনালির দেয়ালের কোষ এবং রক্তে চলাচলকারী কিছু প্রোটিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ক বোঝা গেলে তরুণদের স্ট্রোক প্রতিরোধে নতুন গবেষণার পথ তৈরি হতে পারে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন, রক্তের গ্রুপ স্ট্রোকের একমাত্র বা প্রধান ঝুঁকি নয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলোর একটি। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস, ধূমপান, উচ্চ কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন, হৃদ্‌রোগ, অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থাৎ রক্তের গ্রুপ জানা উপকারী হতে পারে, কিন্তু জীবনযাপন ও চিকিৎসাগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণই স্ট্রোক প্রতিরোধে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চিনতে পারাও জীবন বাঁচাতে পারে। আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশন F.A.S.T. পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলে-Face বা মুখ বেঁকে যাওয়া, Arm বা এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া, Speech বা কথা জড়িয়ে যাওয়া, এবং Time বা দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া। এ ছাড়া হঠাৎ ভারসাম্য হারানো, চোখে ঝাপসা দেখা, তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়াও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

 

মায়ো ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান বন্ধ, অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার জরুরি। তরুণ বয়সেও এসব ঝুঁকিকে অবহেলা করা ঠিক নয়, কারণ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে কম বয়সী মানুষের মধ্যেও ইস্কেমিক স্ট্রোক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে।


সম্পর্কিত নিউজ