{{ news.section.title }}
কখন চা-কফি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে?
চা-কফি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুব পরিচিত পানীয়। সকাল শুরু করা, কাজের ফাঁকে সতেজ হওয়া কিংবা আড্ডার টেবিল-সব জায়গাতেই চা বা কফির উপস্থিতি থাকে। পরিমিত পরিমাণে চা-কফি অনেকের জন্য উপকারীও হতে পারে। তবে ভুল সময়ে, অতিরিক্ত পরিমাণে বা কিছু বিশেষ অবস্থায় চা-কফি পান করলে তা শরীরের জন্য অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, চা-কফি পান করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সময়, পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা। কারও অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে, কারও ঘুমের সমস্যা থাকলে কিংবা কারও রক্তশূন্যতা থাকলে একই অভ্যাস সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ নাও হতে পারে।
খালি পেটে চা-কফি কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
অনেকের দিনের প্রথম অভ্যাসই হলো ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে চা বা কফি পান করা। কিন্তু এই অভ্যাস পাকস্থলীর জন্য ভালো নয়। খালি পেটে চা-কফি পান করলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের প্রভাব বাড়তে পারে। এর ফলে বুক জ্বালাপোড়া, পেটে অস্বস্তি, ঢেকুর, টকভাব কিংবা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যাদের আগে থেকেই অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে খালি পেটে চা-কফি আরও বেশি অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। পাকস্থলীতে খাবার না থাকলে চা-কফির ক্যাফেইন ও অন্যান্য উপাদান সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঘুম থেকে উঠেই চা-কফি না খেয়ে আগে পানি পান করা এবং হালকা কিছু খাওয়ার পর চা বা কফি নেওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
খাবারের পরপরই চা-কফি পান করাও ঠিক নয়
খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা খাবারের পরপরই চা-কফি পান করার অভ্যাসও অনেকের আছে। কিন্তু এটি শরীরের পুষ্টি গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। চা ও কফিতে থাকা ট্যানিন খাবারের আয়রন শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে উদ্ভিদজাত খাবার থেকে পাওয়া নন-হিম আয়রন শোষণে বাধা তৈরি হতে পারে। হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক তথ্যভাণ্ডারেও বলা হয়েছে, চা-কফিতে থাকা ট্যানিন আয়রন শোষণ কমাতে পারে।
এ কারণে খাবারের ঠিক পরপর চা-কফি খেলে দীর্ঘমেয়াদে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে, বিশেষ করে যাদের খাদ্যতালিকায় আয়রন কম থাকে বা যারা আগে থেকেই রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। তাই দুপুর বা রাতের খাবারের পর চা-কফি খেতে চাইলে অন্তত এক ঘণ্টা বিরতি রাখা ভালো।
খাবারের পরপর চা-কফি পান করলে আরেকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাকস্থলীতে থাকা খাবার ও অ্যাসিড খাদ্যনালির দিকে উঠে আসতে পারে। এতে বুক জ্বালাপোড়া, মুখে টকভাব, খাবার উঠে আসার অনুভূতি বা অস্বস্তি হতে পারে। যাদের রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
চা-কফি খাওয়ার ভালো সময় কখন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চা-কফি পান করার তুলনামূলক ভালো সময় হলো খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পর। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নয়, বরং নাস্তার পর কিছুটা সময় বিরতি দিয়ে চা বা কফি পান করা ভালো। এতে পাকস্থলীর ওপর চাপ কম পড়ে এবং অ্যাসিডিটির ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকে।
সকালের নাস্তার ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর চা-কফি নেওয়া যেতে পারে। দুপুরের খাবারের পর ক্লান্তি কাটাতে চাইলে অন্তত ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করা উচিত। বিকেলে চা-কফি পান করা যেতে পারে, তবে সেটি যেন খুব দেরি না হয়। যারা রাতে ঘুমের সমস্যায় ভোগেন, তাদের বিকেলের পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলাই ভালো।
সন্ধ্যা বা রাতে চা-কফি কেন এড়িয়ে চলা উচিত?
চা-কফির অন্যতম সক্রিয় উপাদান ক্যাফেইন। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে এবং কিছু সময়ের জন্য সতেজতা বা জাগ্রত ভাব তৈরি করে। কিন্তু এই একই কারণেই রাতে চা-কফি পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাফেইনের উদ্দীপক প্রভাব শরীরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে এবং ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর ৬ ঘণ্টা আগেও ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুমের ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-সংশ্লিষ্ট ঘুমবিষয়ক নির্দেশিকাতেও ঘুমানোর ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা আগে চা, কফি, চকলেট, কোকো বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তাই রাতে বা ঘুমানোর আগে চা-কফি পান করলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে, ঘুম ভেঙে যেতে পারে কিংবা ঘুমের মান কমে যেতে পারে। অনেকে আবার রাতে চা-কফি খাওয়ার পর শুয়ে পড়লে মুখে টকভাব, বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যায় পড়েন। ফলে রাতের সময় চা-কফির বদলে কুসুম গরম পানি বা ক্যাফেইনমুক্ত হালকা পানীয় বেছে নেওয়া ভালো।
দিনে কত কাপ চা-কফি নিরাপদ?
চা-কফি কতটা খাওয়া যাবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং পানীয়ের ধরন অনুযায়ী। সাধারণভাবে বেশিরভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইনকে নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ জানিয়েছে, বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন সাধারণত নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে ক্যাফেইনের সহনশীলতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
মায়ো ক্লিনিকও একইভাবে বলছে, বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে কফির ধরন, কাপের আকার এবং বানানোর পদ্ধতির ওপর ক্যাফেইনের পরিমাণ অনেকটা নির্ভর করে।
বাংলাদেশের দৈনন্দিন অভ্যাস বিবেচনায় দিনে ২ থেকে ৩ কাপের মধ্যে চা-কফি সীমিত রাখা ভালো। যাদের অ্যাসিডিটি, অনিদ্রা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ বা গর্ভাবস্থার মতো বিশেষ অবস্থা আছে, তাদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিনি ও ঘন লিকারও সমস্যা বাড়াতে পারে
অনেকে চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করেন। আবার কারও পছন্দ ঘন লিকার, মসলা চা বা দুধ-চিনি বেশি দেওয়া চা। এগুলো নিয়মিত বেশি পরিমাণে খেলে ওজন বাড়া, রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি এবং অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঘন লিকার চা বা অতিরিক্ত মসলা দেওয়া চা অনেকের পাকস্থলীতে অস্বস্তি তৈরি করে।
চা-কফি পান করতে হলে চিনির পরিমাণ কম রাখা ভালো। সম্ভব হলে চিনি ছাড়া বা খুব সামান্য চিনি দিয়ে পান করা উচিত। যারা ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি বা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য চিনি কমানো আরও জরুরি।
ওষুধের সঙ্গে চা-কফি নয়
ওষুধ খাওয়ার সময় চা বা কফি ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেকেই পানির বদলে চা দিয়ে ওষুধ খান, যা নিরাপদ অভ্যাস নয়। চা-কফির কিছু উপাদান কিছু ওষুধের শোষণ বা কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওষুধ সবসময় সাধারণ পানি দিয়ে খাওয়া উচিত। কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ খাওয়ার আগে বা পরে চা-কফি নেওয়া যাবে কি না, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
যাদের বেশি সতর্ক থাকা দরকার
যাদের দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক, আলসার, রিফ্লাক্স, অনিদ্রা, উদ্বেগ, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে, তাদের চা-কফির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার। গর্ভবতী নারী, কিশোর-কিশোরী এবং ক্যাফেইনে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো।
নিরাপদ অভ্যাস কী হতে পারে?
সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে পানি পান করুন। তারপর হালকা নাস্তা করে কিছু সময় বিরতি দিয়ে চা বা কফি নিন। দুপুর বা রাতের খাবারের পরপরই চা-কফি খাবেন না, অন্তত এক ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। বিকেলের পর ক্যাফেইন কমিয়ে দিন, বিশেষ করে যদি ঘুমের সমস্যা থাকে। দিনে ২ থেকে ৩ কাপের বেশি চা-কফি না খাওয়াই ভালো। চিনি কমান, ঘন লিকার এড়িয়ে চলুন এবং ওষুধ কখনো চা-কফির সঙ্গে খাবেন না।
চা-কফি পুরোপুরি ক্ষতিকর নয়। বরং সঠিক সময়ে, পরিমিত পরিমাণে এবং নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে পান করলে এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবেই থাকতে পারে। কিন্তু খালি পেটে, খাবারের পরপরই, রাতে ঘুমানোর আগে বা অতিরিক্ত পরিমাণে চা-কফি পান করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।