{{ news.section.title }}
ঘুমানোর সময় শরীর কী করে জানলে আর কখনোই রাত জাগবেন না!
রাতের নিস্তব্ধতায় যখন আপনি ঘুমে আচ্ছন্ন, আপনার চামড়ার নিচে তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে এক অন্যরকম জগত। ঘুম মানেই শুধুমাত্র অলস বিশ্রামই নয়, এটি আপনার শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জন্য একটি নাইট শিফট ডিউটি! মস্তিষ্ক থেকে লিভার, প্রতিটি অঙ্গ প্রতি রাতে এক জটিল ছন্দে কাজ করে যায় আপনাকে সতেজ রাখতে। এই অদৃশ্য কারখানার কর্মযজ্ঞ আর ঘুমের নেপথ্যে থাকা মেরামতি বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি।
ঘুমের সময় সবথেকে বেশি কাজ করে আমাদের মস্তিষ্ক। একে বলা হয় 'গ্লি্যামফ্যাটিক সিস্টেম' (Glymphatic System) বা মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা। সারাদিন কাজ করার ফলে মস্তিষ্কে যেসব টক্সিক প্রোটিন, যেমন: বিটা-অ্যামাইলয়েড জমা হয়, গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সেই বিষাক্ত পদার্থগুলো ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলে। পাশাপাশি চলে 'মেমোরি কনসোলিডেশন'। সারাদিনের হাজারো তথ্যের মধ্যে কোনটি জরুরি আর কোনটি অপ্রয়োজনীয়, তা মস্তিষ্ক এই সময়েই বাছাই করে। আপনার শেখা নতুন তথ্যগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয় ঘুমের মধ্যেই। তাই পরীক্ষার আগে না ঘুমিয়ে পড়ার চেয়ে, পড়ে ঘুমানো অনেক বেশি কার্যকর।
হৃদপিণ্ড আপনার শরীরের একমাত্র পেশি যা কখনো থামে না। তবে ঘুমের সময় এটি কিছুটা 'লো-পাওয়ার মোড' এ চলে যায়। ঘুমানোর সময় হার্ট রেট এবং রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে ২০-৩০ শতাংশ কমে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'নক্টার্নাল ডিপিং' (Nocturnal Dipping)। এই সময় হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালীগুলো নিজেদের টিস্যু মেরামত করার এবং সারাদিনের ধকল থেকে সেরে ওঠার সুযোগ পায়। যারা পর্যাপ্ত ঘুমান না, তাদের হৃদপিণ্ড এই বিশ্রামের সুযোগ পায় না, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ঘুমের সময় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কমে যায় এবং তা একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলতে থাকে। এই সময় ফুসফুস তার চারপাশের পেশিগুলোকে কিছুটা শিথিল করে দেয়। তবে ঘুমের বিশেষ পর্যায় অর্থাৎ
REM (Rapid Eye Movement) ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস আবার দ্রুত ও অনিয়মিত হতে পারে। এই সময়েই আমরা স্বপ্ন দেখি। ঘুমের গভীরতায় ফুসফুস মূলত রক্তে অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দেওয়ার কাজটি ধীর কিন্তু নিখুঁতভাবে করে যায়।
আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি, তখন আমাদের পাকস্থলী এবং অন্ত্রের কাজ অনেক ধীর হয়ে যায়। এজন্যই ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খেলে হজমে সমস্যা হয়। তবে এই সময় সবথেকে সক্রিয় থাকে লিভার বা যকৃৎ। লিভার রাতের বেলা রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে বের করে দেয় এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ সঞ্চয় করে রাখে। ঘুমের অভাব হলে লিভারের এই স্বাভাবিক ডিটক্স প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা মেদবৃদ্ধি এবং লিভারের সমস্যার কারণ হতে পারে।
তারুণ্য ধরে রাখার গোপন সময়!
রাতের বেলাকে বলা হয় ত্বকের 'গোল্ডেন পিরিয়ড'। ঘুমের সময় শরীরের গ্রোথ হরমোন (Growth Hormone) সবথেকে বেশি নিঃসৃত হয়। এই হরমোন কোষের বিভাজন বাড়ায় এবং কোলাজেন তৈরি করে, যা ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে। ঘুমের অভাব হলে আমাদের চোখের নিচে কালি পড়ে এবং ত্বক ফ্যাকাসে দেখায়, কারণ তখন কোষ পুনর্গঠনের কাজ ব্যাহত হয়। মূলত ঘুমের মধ্যেই আমাদের শরীরের ভাঙা হাড় জোড়া লাগে বা ক্ষতস্থান দ্রুত শুকিয়ে যায়।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
আপনি যখন ঘুমান, আপনার শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা 'সাইটোকাইন' (Cytokine) নামক এক ধরণের প্রোটিন তৈরি করে। এটি মূলত শরীরের সুরক্ষা বাহিনী। কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এই প্রোটিনটি প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুমের অভাবে সাইটোকাইন উৎপাদন কমে যায়, ফলে শরীর দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ভ্যাক্সিন বা ওষুধ ঠিকঠাক কাজ করে না।
পরিশেষে বলা যায়, ঘুম কোনো বিলাসিতার কিছু নয়, বরং এটি বেঁচে থাকার এক জৈবিক আবশ্যকতা। আপনার দেহের প্রতিটি অঙ্গ রাতে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, তার উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো আপনাকে সুস্থ রাখা। যখন আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমের সময় কমিয়ে দেই, তখন আমরা আসলে আমাদের শরীরের এই মেরামতির কাজে বাধা দেই!