যেসব ফলের রস খেলেও বাড়তে পারে সুগার

যেসব ফলের রস খেলেও বাড়তে পারে সুগার
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

ফল খাওয়া যে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী-এ কথা প্রায় সবারই জানা। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফল রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা। তবে বাস্তবতা হলো, সব ফল বা ফলের রস সবার জন্য সমানভাবে উপকারী নয়। বিশেষ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অনেকেই মনে করেন, ফলের রস মানেই স্বাস্থ্যকর। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, কিছু কিছু ফলের রস নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে-এমনকি সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও।

 

ফলের রস কেন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে

ফলের রসে মূলত প্রাকৃতিক চিনি যেমন ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ থাকে। এগুলো শরীরে দ্রুত শোষিত হয়। সমস্যা হচ্ছে, ফল থেকে যখন রস তৈরি করা হয়, তখন এর বেশিরভাগ ফাইবার বা আঁশ বাদ পড়ে যায়।

ফাইবার শরীরে শর্করার শোষণ ধীর করে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু রসে ফাইবার না থাকায় চিনি দ্রুত রক্তে মিশে যায়, ফলে হঠাৎ করে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে ‘গ্লুকোজ স্পাইক’ বলা হয়।

 

যেসব ফলের রস বেশি প্রভাব ফেলে

সব ফলের রস একরকম প্রভাব ফেলে না। গবেষণায় দেখা গেছে-

 

  • আপেলের রস
  • আঙুরের রস
  • আমের রস


এসব রসে প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ বেশি থাকায় এগুলো দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে গরমকালে জনপ্রিয় আমের জুস অতিরিক্ত খেলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, পাল্পযুক্ত বা আঁশসমৃদ্ধ রস তুলনামূলকভাবে ধীরে প্রভাব ফেলে। যেমন কমলার রস যদি পাল্পসহ খাওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকে।

 

গবেষণা কী বলছে

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় বা ফলের রস পান করলে দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ফলের রস পান করলে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

ডায়াবেটিস না থাকলেও সতর্কতা জরুরি

অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস না থাকলে ফলের রস যত খুশি খাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। সুস্থ মানুষের শরীর ইনসুলিনের মাধ্যমে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বারবার গ্লুকোজ স্পাইক হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিপাকক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা প্রিডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তাদের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা আগেই কিছুটা কম থাকে।

 

ফল বনাম ফলের রস-পার্থক্য কোথায়

গোটা ফল ও ফলের রসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ফাইবার।

গোটা ফলে থাকে-

  • পর্যাপ্ত ফাইবার
  • ভিটামিন
  • খনিজ উপাদান


এই ফাইবার শর্করার শোষণ ধীর করে এবং দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়ে না। অন্যদিকে ফলের রসে ফাইবার প্রায় থাকে না বললেই চলে। ফলে একই পরিমাণ ফল রস হিসেবে খেলে শরীরে বেশি চিনি একসঙ্গে প্রবেশ করে।

 

প্যাকেটজাত জুস আরও ক্ষতিকর

বাজারে পাওয়া প্যাকেটজাত ফলের রস অনেক ক্ষেত্রে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম স্বাদ ও সংরক্ষণকারী উপাদান যোগ করা থাকে। এগুলো শুধু শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, বরং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণের মাধ্যমে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ায়।

 

কীভাবে নিরাপদে ফলের রস খাবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নিয়ম মেনে চললে ফলের রস খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে-

  • একবারে ৪–৬ আউন্স বা এক গ্লাসের বেশি না খাওয়া
  • খালি পেটে রস না খাওয়া
  • রসের সঙ্গে প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া (যেমন বাদাম)
  • অতিরিক্ত চিনি না মেশানো
  • সম্ভব হলে ১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক ঘরে তৈরি রস বেছে নেওয়া

সম্পূর্ণ বাদ নয়, পরিমিতি জরুরি

গবেষণা বলছে, পরিমিত পরিমাণে খাঁটি ফলের রস সরাসরি ডায়াবেটিসের কারণ হয় না। সমস্যা হয় তখনই, যখন এটি অতিরিক্ত বা নিয়মিত বেশি পরিমাণে পান করা হয়। ফল শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ফলের রস সবসময় সেই একই উপকার দেয় না। বরং ভুলভাবে বা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য সবচেয়ে ভালো অভ্যাস হলো-রসের চেয়ে গোটা ফল খাওয়ার দিকে ঝোঁক বাড়ানো এবং রস পান করলেও তা সীমিত পরিমাণে রাখা। এতে শরীর যেমন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে, তেমনি রক্তে শর্করার ভারসাম্যও বজায় থাকবে।


সম্পর্কিত নিউজ