{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে কমল স্বর্ণের দাম, কারণ কী?
বিশ্ববাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো দরপতনের মুখে পড়েছে মূল্যবান এই ধাতু। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কাই স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
শুক্রবার (২২ মে) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক স্পট গোল্ডের দাম ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫১৫ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়ায়। দিনের শুরুতে দাম প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। সপ্তাহজুড়ে স্পট গোল্ডের দর কমেছে প্রায় ০.৪ শতাংশ। একই দিনে জুনে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন গোল্ড ফিউচার ০.৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫২৩ দশমিক ২০ ডলারে স্থির হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাধারণত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝোঁকেন। কারণ স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় তেলের দাম বেড়েছে, আর জ্বালানির দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি রাখতে পারে, এমনকি আরও বাড়াতেও পারে-এমন ধারণাই স্বর্ণের চাহিদা কমিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান স্টোনএক্সের বিশ্লেষক রোনা ও’কানেল বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন অনেকটাই বিভ্রান্ত অবস্থায় আছেন। তার মতে, বাজারের নজর এখন হরমুজ প্রণালি এবং সেখানকার সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার দিকে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সেই সূত্রে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালি বিশেষভাবে সংবেদনশীল; এখানে কোনো অচলাবস্থা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন খরচ ও বৈশ্বিক বাজারদরে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা থেকে দ্রুত কোনো ফল আসবে না-এমন ধারণার পর অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন, পরিবহন, খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের খরচ বাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমানোর বদলে উচ্চ রাখার দিকে ঠেলে দেয়।
স্বর্ণের জন্য সুদের হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বর্ণ নিজে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। তাই যখন ট্রেজারি বন্ড বা অন্যান্য সুদযুক্ত সম্পদের মুনাফা বাড়ে, তখন অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের বদলে সেসব সম্পদের দিকে ঝোঁকেন। শুক্রবার মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড এক বছরের বেশি সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি ছিল, যা স্বর্ণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে এখন ধারণা তৈরি হয়েছে যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়াতে পারে। Reuters জানিয়েছে, এই সম্ভাবনার হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ শতাংশে। ফেড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালারও সম্প্রতি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত সুদের হার কমানোর পক্ষপাতমূলক অবস্থান থেকে সরে এসে হার বাড়ানোর সম্ভাবনাও খোলা রাখা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থাও বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের মে মাসের চূড়ান্ত জরিপে ভোক্তা আস্থা সূচক নেমে এসেছে ৪৪.৮-এ, যা এপ্রিলের ৪৯.৮ থেকে ১০ শতাংশ কম। জরিপে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে এক বছর মেয়াদি মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা ৪.৭ শতাংশ থেকে ৪.৮ শতাংশে এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা ৩.৫ শতাংশ থেকে ৩.৯ শতাংশে উঠেছে।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। শুক্রবার স্পট সিলভার বা রুপার দাম ১.১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৫.৮৫ ডলারে নেমেছে। প্ল্যাটিনামের দাম ২.৫ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯১৬ দশমিক ৬২ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২.১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৪৯ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। Reuters জানিয়েছে, সপ্তাহ শেষে এসব ধাতুও লোকসানের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের বাজার এখন দুটি বিপরীত শক্তির মধ্যে আটকে আছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা, সরবরাহ সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তা স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আকর্ষণীয় করে তোলে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার, শক্তিশালী বন্ড ইল্ড ও ডলারের চাপ স্বর্ণের চাহিদা কমায়। ফলে স্বর্ণের দাম এখন শুধু যুদ্ধ বা সংকটের ওপর নয়, বরং ফেডের সুদের হার, তেলের দাম, ডলারের গতি এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার ওপরও নির্ভর করছে।
বাংলাদেশের বাজারেও আন্তর্জাতিক স্বর্ণদরের ওঠানামা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তবে বিশ্ববাজারে দাম কমলেই দেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে একই হারে দাম কমে যায় না। কারণ স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক দর ছাড়াও ডলারের বিনিময় হার, তেজাবি স্বর্ণের স্থানীয় দর, আমদানি ব্যয়, কর, ভ্যাট ও বাজার চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের বাজারে বাজুসের পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ে তার প্রভাব দেখা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম সাধারণত ট্রয় আউন্স হিসেবে হিসাব করা হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত এক ভরি স্বর্ণের ওজন প্রায় ১১.৬৬৪ গ্রাম, যা প্রায় ০.৩৭৫ ট্রয় আউন্সের সমান। তাই আন্তর্জাতিক প্রতি আউন্স দরের সঙ্গে দেশের প্রতি ভরি দামের হিসাব সরাসরি মিলিয়ে দেখার সময় ওজনের এই পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স