{{ news.section.title }}
বিমান ভাড়া কমালো মালয়েশিয়া
আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় নিজেদের সব রুটে বিমান ভাড়া কমানোর ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা এয়ারএশিয়া এক্স (AirAsia X)। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ১৫ জুন থেকে টিকিটের মূল্য গড়ে ৫ শতাংশ কমানো হয়েছে এবং জ্বালানির দাম আরও কমতে থাকলে ভবিষ্যতে ভাড়াও নতুন করে সমন্বয় করা হবে।
এয়ারএশিয়া এক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বো লিঙ্গাম (Bo Lingam) সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক সমঝোতার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান শিল্পে। তিনি জানান, জ্বালানির মূল্য কমার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের সেই সুবিধা পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটি সপ্তাহভিত্তিক ভাড়া পর্যালোচনা করছে।
বো লিঙ্গাম বলেন, “জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পুরো বিমান শিল্পই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমরা আশা করছি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। জ্বালানির দাম আরও কমলে আমরা ভাড়াও পুনর্বিবেচনা করব।”
আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণে সিঙ্গাপুর জেট ফুয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ২৪২ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সেই দাম কমে প্রায় ১১২ ডলারে নেমে এসেছে। যদিও এটি এখনও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের প্রায় ৮০ ডলার প্রতি ব্যারেল মূল্যের তুলনায় বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, জেট ফুয়েল বিমান পরিচালনার অন্যতম বড় ব্যয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি এয়ারলাইনের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। ফলে জ্বালানির দামের সামান্য ওঠানামাও টিকিটের মূল্যে বড় প্রভাব ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠার সময় এয়ারএশিয়া এক্সসহ এশিয়ার অনেক বিমান সংস্থাই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় সামাল দিতে এয়ারএশিয়া এক্সকে কিছু রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমাতে হয়, কিছু অলাভজনক রুট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয় এবং যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করতে হয়। সে সময় সংস্থাটি ভাড়া ৩১ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছিল এবং ফুয়েল সারচার্জও প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছিল।
শুধু এয়ারএশিয়া এক্স নয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এশিয়ার বিভিন্ন এয়ারলাইনসও সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা কমিয়েছে। থাই এয়ারএশিয়া গত মে ও জুন মাসে প্রায় ৩০ শতাংশ আসন সক্ষমতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট কমানো হয়।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুর আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব এয়ারএশিয়া এক্সের আর্থিক ফলাফলেও পড়েছিল। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে পড়ে এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপকে সেই ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। এমনকি অনিশ্চিত বাজার পরিস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের কিছু ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রাও স্থগিত রাখে।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিমান খাতের জন্য নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। এয়ারএশিয়া এক্স জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে তারা অলাভজনক ফ্লাইট কমিয়েছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করেছে এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো কিছু বিমান বহর থেকে সরিয়ে আরও জ্বালানি-সাশ্রয়ী আধুনিক বিমান যুক্ত করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে।
সংস্থাটি আশা করছে, আগস্টের মধ্যে তাদের ফ্লাইট সক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে যেসব রুটে যাত্রী চাহিদা কম এবং পরিচালন ব্যয় বেশি, সেগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিমান শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, জেট ফুয়েলের মূল্য কমতে থাকলে শুধু এয়ারএশিয়া এক্স নয়, এশিয়ার আরও অনেক এয়ারলাইন ধীরে ধীরে টিকিটের দাম কমাতে পারে। এতে পর্যটন শিল্পে নতুন গতি আসবে এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আরও সহজ হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটননির্ভর অর্থনীতিগুলো এ সুবিধা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির বাজারে বর্তমান স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিমান ভাড়া আরও কমতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবণতার ওপর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
এদিকে ভাড়া কমানোর ঘোষণার পর মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে বুকিংয়ের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে এয়ারএশিয়া এক্স। সংস্থাটির কর্মকর্তারা আশা করছেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে যাত্রী চাহিদা আরও শক্তিশালী হবে এবং সাম্প্রতিক সংকট কাটিয়ে বিমান শিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে।