{{ news.section.title }}
ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, কে তিনি?
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য এর আগে দুবার ব্যর্থ হলেও সাম্প্রতিক বিশেষ উপনির্বাচনে তার বড় জয় তাকে আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শুধু দলীয় নেতৃত্ব নয়, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এখন তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখছেন।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে যখন লেবার পার্টির ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে এবং দলটি আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন কৌশল খুঁজছে, তখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসার পর তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে ফিরেছেন বার্নহ্যাম। এখন লেবার পার্টির নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হলে তার প্রয়োজন হবে অন্তত ৮০ জন লেবার এমপির সমর্থন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে অনেকেই ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে চেনেন। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সে সময় তিনি যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলের মানুষের পক্ষে যেভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন, তা তাকে জাতীয় পর্যায়ে একজন স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী নেতার পরিচয় দেয়।
১৯৭০ সালে লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহ্যামের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। তার বাবা ছিলেন টেলিফোন প্রকৌশলী এবং মা চিকিৎসকের রিসেপশনিস্ট। চেশায়ারের কালচেথ এলাকায় বেড়ে ওঠা বার্নহ্যাম ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি, সমাজ এবং জনসেবার প্রতি আগ্রহী ছিলেন।
আইরিশ বংশোদ্ভূত বার্নহ্যাম রোমান ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই তার রাজনৈতিক যাত্রার ভিত্তি তৈরি হয়।
কেমব্রিজে পড়ার সময়ই পরিচয় হয় নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া মেরি-ফ্রান্স ভ্যান হিলের সঙ্গে। পরে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের তিন সন্তান রয়েছে। পরিবারকে সবসময় নিজের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন বার্নহ্যাম।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি দক্ষিণ লন্ডনের সংসদ সদস্য টেসা জাওয়েলের গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস স্মিথের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
২০০১ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন বার্নহ্যাম। নিজের বেড়ে ওঠার এলাকার কাছাকাছি লেই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ‘নিউ লেবার’ সরকারের অংশ হন।
পরবর্তীতে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ট্রেজারির প্রধান সচিব, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রী এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০০৯ সালে। লিভারপুলের হিলসবোরো স্টেডিয়াম দুর্ঘটনার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েন। ১৯৮৯ সালের ওই দুর্ঘটনায় ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক নিহত হয়েছিলেন।
সেই ঘটনার পর বার্নহ্যাম নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন। পুলিশের ভূমিকা, তদন্তের অসঙ্গতি এবং গণমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি দ্বিতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে হিলসবোরো ট্র্যাজেডি নিয়ে নতুন তদন্ত শুরু হওয়ার পেছনে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১০ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতা হারানোর পর প্রথমবারের মতো দলীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন বার্নহ্যাম। তবে তিনি চতুর্থ স্থানে থেকে পরাজিত হন। ২০১৫ সালে আবারও নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সে সময় অনেকেই তাকে সম্ভাব্য বিজয়ী মনে করলেও শেষ পর্যন্ত জেরেমি করবিনের কাছে হেরে যান।
করবিনের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পরে তার দলে কাজ করেন বার্নহ্যাম। তবে ২০১৭ সালে তিনি ওয়েস্টমিনস্টার ছেড়ে স্থানীয় রাজনীতিতে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হন। সেখানেই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তিনি পরিবহন ব্যবস্থা সংস্কার, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে বাস পরিবহন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ ব্যাপক প্রশংসা পায়।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট ফোর্ডের মতে, বার্নহ্যামের সবচেয়ে বড় শক্তি তার যোগাযোগ দক্ষতা। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারেন এবং জটিল নীতিগত বিষয়কেও সহজভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম।
ফোর্ডের ভাষায়, “তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, একজন দক্ষ গল্পকারও। ভোটারদের কাছে তিনি স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন তিনি কে, কার পক্ষে এবং কী করতে চান।”
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তার নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের লকডাউন নীতির বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেন। তবে সমালোচকরাও কম নন।
অনেকের অভিযোগ, বার্নহ্যাম রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নমনীয়। টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন এবং জেরেমি করবিন-এই তিন ভিন্ন ধারার নেতার অধীনে কাজ করার কারণে তার বিরুদ্ধে প্রায়ই ‘রাজনৈতিক রং বদলানোর’ অভিযোগ ওঠে। এমনকি ২০২২ সালে কিয়ার স্টারমারও তাকে নিয়ে রসিকতা করেছিলেন। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছিলেন, বার্নহ্যাম একই সঙ্গে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, মরক্কো এবং ক্রোয়েশিয়ার সমর্থক হওয়ার মতো অবস্থান নিয়েছেন। তবে তার সমর্থকদের মতে, এটি দুর্বলতা নয়; বরং বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার প্রমাণ।
বার্নহ্যামের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাজ্যের অতিরিক্ত ‘লন্ডনকেন্দ্রিকতা’র বিরোধিতা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, আঞ্চলিক বৈষম্য ব্রিটেনের অন্যতম বড় সমস্যা এবং গত চার দশকে দেশটি ভুল পথে এগিয়েছে।
তার মতে, জাতীয় উন্নয়নের সুফল শুধু লন্ডনে সীমাবদ্ধ না রেখে উত্তর ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য অঞ্চলেও সমানভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন। তবে অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে তার কিছু বক্তব্য বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। গত বছর তিনি বলেছিলেন, লেবার পার্টিকে “বন্ড মার্কেটের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।” পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু সাক্ষাৎকারেও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে তাকে কিছুটা অস্পষ্ট মনে হয়েছে। তবুও ম্যানচেস্টারে মেয়র হিসেবে তিনি ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করে বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-ম্যানচেস্টারে সফল নেতৃত্ব কি তাকে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছে দিতে পারবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় শহর পরিচালনা এবং পুরো দেশ পরিচালনা এক নয়। ডাউনিং স্ট্রিটে প্রতিদিন শতাধিক জটিল ইস্যু মোকাবিলা করতে হয়। সেখানে ভুলের সুযোগ খুব কম।
তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে লেবার পার্টির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা যখন নিম্নমুখী এবং নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, তখন বার্নহ্যাম অনেকের কাছে এমন একজন নেতা, যিনি আবারও লেবারকে নতুন প্রাণ দিতে পারেন।
আগামী কয়েক সপ্তাহেই স্পষ্ট হবে, তিনি কেবল ‘কিং অব দ্য নর্থ’ হিসেবেই থাকবেন, নাকি সত্যিই ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করবেন।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস