টিকা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, জনস্বাস্থ্যে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত

টিকা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, জনস্বাস্থ্যে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত
ছবির ক্যাপশান, টিকা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, জনস্বাস্থ্যে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে টিকা সরবরাহ ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া, টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং স্বাস্থ্য খাতের কিছু অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকার কারণে শিশুদের সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১টি রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত টিকার সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আরও ১৫টি রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এতে সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বিভিন্ন বয়সে দেওয়া সাত ধরনের টিকার মাধ্যমে যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, রুবেলা, নিউমোনিয়া, হেপাটাইটিস-বি, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, টাইফয়েড ও রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে টিকা সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় অনেক শিশু সময়মতো পূর্ণ ডোজ পায়নি। এর প্রভাব এখন হাম ও রুবেলার সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে।

 

হাম পরিস্থিতি ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চের পর থেকে দেশে হাজারো সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৯০০টির বেশি হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এক মাসের কম সময়ে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্যও সামনে এসেছে। আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু, বিশেষ করে শূন্য ডোজ বা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়। পরবর্তী ধাপে সিটি করপোরেশন এলাকা এবং দেশব্যাপী কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

তবে শুধু হাম নয়, স্বাস্থ্য খাতের স্থবিরতার প্রভাব আরও বিস্তৃত। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ বা বিলম্বিত হওয়ায় যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর, টাইফয়েড, পোলিও, এইচআইভি, নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর নতুন কর্মসূচি সময়মতো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সেবা, সরবরাহ ও তদারকিতে ঘাটতি দেখা দেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

 

টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। আগে আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা হলেও পরে নিজস্বভাবে কেনার সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক বিলম্ব দেখা দেয়। পরে আবার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে যুক্ত করা হলেও সময়ক্ষেপণের কারণে গত বছরের শেষ পর্যন্ত টিকা সরবরাহে ঘাটতি ছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সবসময় বোঝা যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক তৈরি হয়। হাম সংক্রমণ সেই ঝুঁকির একটি বড় সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার কভারেজে ব্যাঘাত শিশুদের মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি করেছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জরুরি ভিত্তিতে টিকার মজুত নিশ্চিত করা, স্থগিত অপারেশন প্ল্যান দ্রুত চালু করা, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম সচল রাখা এবং রোগ নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে হাম বা জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে স্থানীয় দোকান থেকে ওষুধ না নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

 

জনস্বাস্থ্য খাতের এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শিশুস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সুরক্ষা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই টিকাদান ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে জরুরি স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জোরালো হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ