{{ news.section.title }}
রোগ প্রতিরোধে অবহেলা হলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বেই
বাংলাদেশে সাধারণত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হয় হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ, আইসিইউ বা চিকিৎসা ব্যয়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রোগ প্রতিরোধ। একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই তাকে সুরক্ষা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল পথ। টিকা, পুষ্টি কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা, রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতা, এসবই রোগ প্রতিরোধের প্রধান ভিত্তি।
দুঃখজনকভাবে আমাদের স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় রোগ প্রতিরোধ অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। সংকট তৈরি হলে হাসপাতাল নিয়ে আলোচনা বাড়ে, কিন্তু কেন এত মানুষ অসুস্থ হলো, সেই প্রশ্নে মনোযোগ কম থাকে। অথচ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে হাসপাতালের ওপর চাপ অনেক কমানো সম্ভব।
হাম, রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা বা নিউমোনিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা প্রমাণিত। শিশু সময়মতো টিকা পেলে জটিল রোগের ঝুঁকি কমে। পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থেকে বাঁচে। হাসপাতালের শয্যা অন্য জরুরি রোগীর জন্য ব্যবহার করা যায়। কিন্তু টিকাদান ব্যাহত হলে একসঙ্গে অনেক শিশু ঝুঁকিতে পড়ে। তখন সংক্রমণ বাড়ে, হাসপাতালে চাপ বাড়ে, মৃত্যু ও জটিলতা বাড়ে।
শুধু টিকা নয়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন, কৃমি নিয়ন্ত্রণ, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, যক্ষ্মা শনাক্তকরণ, এসব কর্মসূচিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বন্ধ বা দুর্বল হলে রোগের বিস্তার বাড়ে। একসময় যে রোগ নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা আবার ফিরে আসে।
রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগকে খরচ মনে করা ভুল। এটি ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি ঠেকানোর বিনিয়োগ। একটি টিকার খরচ কম, কিন্তু টিকা না পেয়ে শিশু অসুস্থ হলে চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি, পরিবারের আয়হানি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির খরচ অনেক বেশি।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। ফলে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি সবসময় থাকে। শহরের বস্তি, গ্রামীণ দরিদ্র এলাকা, চরাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ স্কুলগুলোতে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি। তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব দ্রুত দেখা দেয়।
এ ক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং পরিবার, সবার ভূমিকা আছে। স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা তথ্য যাচাই, মসজিদ-মন্দির-ক্লাবভিত্তিক সচেতনতা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্রিয়তা, এসব উদ্যোগ একসঙ্গে দরকার।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। আতঙ্ক ছড়ানো নয়, তথ্য ছড়ানো দরকার। কোন বয়সে কোন টিকা, কোথায় পাওয়া যায়, কোন লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে, এসব তথ্য সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু বড় হাসপাতাল দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় প্রতিটি শিশুর টিকা কার্ড, প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রতিটি মাঠকর্মী, প্রতিটি রোগ নজরদারি রিপোর্ট এবং প্রতিটি সচেতন পরিবারের মাধ্যমে।
রোগ প্রতিরোধে অবহেলা করলে চিকিৎসা ব্যবস্থা একসময় চাপ সামলাতে পারে না। তাই এখনই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। প্রতিটি টিকা, প্রতিটি সচেতনতা কর্মসূচি এবং প্রতিটি মাঠপর্যায়ের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ সুস্থ সমাজ গড়তে রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ ঠেকানোর সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর।