{{ news.section.title }}
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন, নতুন মূল্যহার কার্যকর
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্যুতের গড় খুচরা ও পাইকারি মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও সমন্বয় করা হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় আবাসিক লাইফ লাইন এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের ট্যারিফ আগের অবস্থায় বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার ফলে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছে সরকার।
শনিবার (৬ জুন) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। ব্রিফিংয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সুপারিশ, গণশুনানি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা পর্যায়ের নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে গত ২০ ও ২১ মে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত ট্যারিফ নিয়ে গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। পরবর্তীতে ৩ জুন কমিশনের আদেশ জারির পর বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানো হয়। সেই পর্যালোচনার পর নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় দুটি বিশেষ গ্রাহক শ্রেণির জন্য আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক লাইফ লাইন (০ থেকে ৫০ ইউনিট) এবং আবাসিক প্রথম ধাপের (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) গ্রাহকদের বিদ্যুতের বিল বাড়ানো হচ্ছে না। দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশ এই দুই শ্রেণির আওতায় থাকায় বিপুলসংখ্যক পরিবার সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে।
নতুন ঘোষণায় পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে খুচরা পর্যায়ে গড় মূল্য বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জে বৃদ্ধি এসেছে প্রায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে।
বিইআরসির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ৭ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। জুন মাস থেকেই নতুন এই মূল্যহার কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় দেশীয় বাজারেও কিছু পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন ঘোষণায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের বড় অংশ ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত বাজারে মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১৩০ টাকা। একইভাবে পেট্রোলের মূল্য ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করা হয়েছে। নতুন এই মূল্যহারও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পেট্রোল ও অকটেন প্রধানত ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে এসব জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ও গণপরিবহনের ভাড়ার ওপর তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে। অন্যদিকে ডিজেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখায় গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়ার সম্ভাবনা কম।
মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়। একই সময়ে পেট্রোলের ব্যবহার প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন এবং অকটেনের ব্যবহার প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। মোট জ্বালানি ব্যবহারের মধ্যে ডিজেলের অংশই সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৮২ শতাংশ।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে সরকার ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থার আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সূচক বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের বিশেষ ট্যারিফ বহাল রাখা এবং ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে বিদ্যুতের গড় মূল্য বৃদ্ধি শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই আগামী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।