{{ news.section.title }}
৭ মিনিটের আক্ষেপে ঘানা, শেষ ৩২-এ ক্রোয়েশিয়া
ফিলাডেলফিয়ার বৃষ্টিভেজা রাতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য আর লুকা মদরিচের জাদুতে শেষ পর্যন্ত নকআউটের টিকিট নিশ্চিত করল ক্রোয়েশিয়া। ঘানার বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ে ২-১ গোলের জয় পেয়েছে ২০১৮ সালের রানার্সআপরা। শেষ দিকে নিকোলা ভ্লাসিচের হেডে পাওয়া এই জয় শুধু ক্রোয়েশিয়াকে শেষ ৩২-এ তুলেই দেয়নি, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন একটি রেকর্ড উপহার দিয়েছে ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচকে।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘এল’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগে সমীকরণ ছিল স্পষ্ট। ক্রোয়েশিয়ার নকআউটে যেতে অন্তত একটি পয়েন্ট প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে ঘানা প্রায় নিশ্চিত অবস্থায় মাঠে নামলেও গ্রুপে আরও ভালো অবস্থান নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার কাছে হার মানতে হয় আফ্রিকার দলটিকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে জ্লাতকো দালিচের দল। সপ্তম মিনিটেই ফ্রি-কিক আদায় করে ক্রোয়েশিয়া। এরপর ১৬ মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ তৈরি করেন নিকোলা ভ্লাসিচ। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ডান পায়ের জোরালো শট নেন তিনি। তবে বল পোস্টের খুব সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।
২০ মিনিটে লুকা মদরিচের ফ্রি-কিক থেকে মারিন পংরাচিচের হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া করে ক্রোয়াটরা। ২৯ মিনিটে ইভান পেরিসিচের হেড দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন ঘানার গোলরক্ষক বেঞ্জামিন আসারে।
এরপরই আসে ম্যাচের প্রথম গোল। ৩১ মিনিটে মাতেও কোভাচিচের পাস থেকে বল পান তরুণ মিডফিল্ডার পেতার সুচিচ। ইন্টার মিলানের এই ফুটবলার বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের কোণায়। ঘানার ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাসেনের পায়ের ফাঁক গলে বল জালে জড়িয়ে গেলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া।
গোল হজমের পর কিছুটা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করে ঘানা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে অঁতোয়ান সেমেনিও দূরপাল্লার একটি শট নেন, যা অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। তবে প্রথম ৪৫ মিনিটে লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো শট নিতে পারেনি কার্লোস কুইরোজের দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্তন আনেন ঘানা কোচ। লেস্টার সিটির উইঙ্গার আবদুল ফাতাউ মাঠে নামার পর বদলে যেতে থাকে ম্যাচের চিত্র। ৫০ মিনিটে ঘানা পেনাল্টি পায়। কিন্তু ইয়োরগেন স্ট্রান্ড লারসেনের দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন ফ্রান্সে খেলা অভিজ্ঞ গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ নয়, এখানে ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ দায়িত্ব পালন করেন-ঘানার সমতায় ফেরার বড় সুযোগটি নষ্ট হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ রিপোর্টে এই মুহূর্তটিকে ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘানার চাপ অব্যাহত থাকে। ৭৩ মিনিটে আর্নেস্ট নুয়ামার ক্রস থেকে বল জালে পাঠান ডেরিক লুকাসেন। অফসাইডের অভিযোগ ওঠায় প্রায় চার মিনিট ধরে ভিএআর পরীক্ষা চলে। শেষ পর্যন্ত কানাডিয়ান রেফারি ড্রু ফিশার গোলের অনুমোদন দিলে ১-১ সমতায় ফেরে ঘানা।
সমতায় ফেরার পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি ঘানার দিকে চলে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল। থমাস পার্টে, ক্বাসি সিবো এবং সেমেনিওর নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালায় ব্ল্যাক স্টারসরা। এ সময় ইনজুরির কারণেও কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে ক্রোয়েশিয়া।
কিন্তু বড় দলগুলো সংকটের সময়ই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখায়। ৮১ মিনিটে মারিও পাশালিচের দূরপাল্লার শট এক হাতে অসাধারণভাবে ঠেকিয়ে দেন বেঞ্জামিন আসারে। কর্নার থেকে আসে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী মুহূর্ত।
৮৩ মিনিটে লুকা মদরিচের কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন নিকোলা ভ্লাসিচ। ঘানার রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে নিচের কোণে পাঠানো সেই হেডই শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়াকে এনে দেয় ২-১ গোলের জয়।
এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস গড়েন লুকা মদরিচ। ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড গড়েন। ২০১তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে নেমে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করেন ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি এই মিডফিল্ডার।
ম্যাচ শেষে ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেন, “আমরা উচ্ছ্বসিত হতে চাই না। কিন্তু দল আজ গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা উতরে গেছে। লুকা অসাধারণ খেলেছে।” আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দালিচ বিশেষভাবে মদরিচের নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতার প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে ঘানা কোচ কার্লোস কুইরোজ ম্যাচ হেরে হতাশ হলেও দলের লড়াইয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বকাপের নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে সেরা তৃতীয় স্থানধারী দল হিসেবে ঘানার নকআউটে ওঠা নিশ্চিত হয়েছে।
ম্যাচ পরিসংখ্যানে বল দখল, পাসের নির্ভুলতা এবং আক্রমণ তৈরিতে এগিয়ে ছিল ক্রোয়েশিয়া। মাতেও কোভাচিচ, মদরিচ এবং সুচিচের মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ পুরো ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়। অন্যদিকে ঘানার হয়ে থমাস পার্টে, সেমেনিও ও নুয়ামা দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ লড়াই করেন।
এই জয়ের ফলে ‘এল’ গ্রুপে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়েছে ক্রোয়েশিয়া। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ঘানা তৃতীয় স্থান থেকে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এর টিকিট পেয়েছে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের নকআউটে ওঠার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে গেছে এই ফলাফলের মাধ্যমে।
২০১৮ সালে রানার্সআপ এবং ২০২২ সালে তৃতীয় হওয়া ক্রোয়েশিয়া আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিল। আর ঘানাও দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছে নতুন স্বপ্ন দেখছে। ফিলাডেলফিয়ার বৃষ্টিভেজা রাতে শেষ হাসি অবশ্য মদরিচদেরই।