উজবেকিস্তানকে হারিয়ে নকআউটে ডিআর কঙ্গো

উজবেকিস্তানকে হারিয়ে নকআউটে ডিআর কঙ্গো
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

আটলান্টার গরম সন্ধ্যায় ইতিহাস লিখল ডিআর কঙ্গো। পিছিয়ে থেকেও উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার দেশটি। একই সঙ্গে শেষ ৩২-এ ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষও নিশ্চিত হয়েছে। আগামী বুধবার আটলান্টাতেই মুখোমুখি হবে দুই দল।

মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটির আগে সমীকরণ ছিল স্পষ্ট। নকআউটে যেতে হলে জিততেই হতো ডিআর কঙ্গোকে। অন্যদিকে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া উজবেকিস্তানের সামনে ছিল সম্মান বাঁচানোর লড়াই। শুরুটা অবশ্য দারুণ করেছিল মধ্য এশিয়ার দেশটি।

 

ম্যাচের ১০ মিনিটেই এগিয়ে যায় উজবেকিস্তান। ডিআর কঙ্গোর দুই ডিফেন্ডার অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে ও অ্যারন ওয়ান-বিসাকার ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেন এলদর শোমুরোদভ। আলগা বল দখলে নিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান রোমা ও উজবেকিস্তানের অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় উজবেকিস্তান।

 

গোল হজমের পরও প্রথমার্ধের বড় অংশে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল উজবেকদের হাতেই। ফাবিও কানাভারোর দল দ্রুত আক্রমণ, ছোট ছোট পাস এবং দুই প্রান্ত ব্যবহার করে বারবার ডিআর কঙ্গোর রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে। প্রথমার্ধে তারা কয়েকটি ভালো সুযোগও তৈরি করে।

 

তবে পিছিয়ে থাকলেও ডিআর কঙ্গো মাঝেমধ্যে পাল্টা আক্রমণে ভয় ছড়ায়। নাথানায়েল এমবুকুর একটি দুর্দান্ত শট গোলরক্ষক আবদুভোহিদ নেমাতভ কষ্ট করে ঠেকিয়ে দেন। আরও একটি আক্রমণ থেকে তারা বল জালে জড়ালেও নিজেদের অর্ধে ফাউলের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়।

 

বিরতির পর একেবারেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। কোচ সেবাস্তিয়ান দেশাব্রের দল অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। ইয়োয়ানে উইসা, মেশাক এলিয়া এবং এমবুকুকে সামনে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে আফ্রিকান প্রতিনিধিরা।

 

৬৬ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ফরোয়ার্ড ইয়োয়ানে উইসাকে বক্সের ভেতরে ফেলে দেন ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।

 

৬৮ মিনিটে স্পটকিক নিতে এসে কোনো ভুল করেননি উইসা। গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে শান্তভাবে বল জালে পাঠান তিনি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো কঙ্গোলিজ সমর্থক তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন। ১-১ সমতায় ফেরে ম্যাচ।

 

সমতার পর পুরো ম্যাচের গতি বদলে যায়। ডিআর কঙ্গো তখন আক্রমণের পর আক্রমণ চালাতে থাকে। ৭৮ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত দ্বিতীয় গোল। মেশাক এলিয়ার শট ডিফ্লেক্ট হয়ে গোলমুখে গেলে সঠিক জায়গায় উপস্থিত ছিলেন বদলি ফরোয়ার্ড ফিস্টন মায়েলে। কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

 

গোল হজমের পর উজবেকিস্তান সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও ডিআর কঙ্গোর রক্ষণ সেদিন বেশ দৃঢ় ছিল। তুয়ানজেবে এবং ওয়ান-বিসাকা প্রথমার্ধের ভুল কাটিয়ে পরে নিজেদের সামলে নেন। মাঝমাঠে চার্লস পিকেল ও স্যামুয়েল মুতুসামি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে আসেন।

 

যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে সব হিসাব চুকিয়ে দেন ইয়োয়ানে উইসা। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর নিখুঁত শট দূরের পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়িয়ে যায়। নিজের দ্বিতীয় গোলের মাধ্যমে ৩-১ ব্যবধানে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন তিনি।

 

এই জয়ের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা ডিআর কঙ্গো নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জয় তুলে নেয়। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও জায়গা করে নেয় তারা। ৫২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়ল আফ্রিকার এই দেশ।

 

গ্রুপ ‘কে’-তে ডিআর কঙ্গো তৃতীয় স্থান নিয়ে সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা পেয়েছে। তাদের ওপরে রয়েছে কলম্বিয়া ও পর্তুগাল। অন্যদিকে টানা তিন ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ শেষ করেছে উজবেকিস্তান। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত হতাশা নিয়েই বিদায় নিতে হয়েছে ফাবিও কানাভারোর দলকে।

 

ইয়োয়ানে উইসা ম্যাচসেরা হয়েছেন। দুই গোলের পাশাপাশি আক্রমণে তাঁর গতি, পজিশনিং এবং নেতৃত্ব ডিআর কঙ্গোর জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্রেন্টফোর্ড ও নিউক্যাসলে খেলা এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরেই এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে আফ্রিকার দেশটি।

 

ম্যাচ শেষে ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেশাব্রে বলেন, তাঁর দল কখনো হাল ছাড়েনি। বিরতির সময় খেলোয়াড়দের বিশ্বাস ধরে রাখতে বলেছিলেন তিনি। সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখেছে।

 

এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেনদের বিপক্ষে লড়তে হবে আফ্রিকার দেশটিকে। তবে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে যেভাবে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে ডিআর কঙ্গো, তাতে ইংল্যান্ডের জন্যও ম্যাচটি সহজ হবে না।

 

আটলান্টার এই রাতটি তাই শুধু একটি জয়ের গল্প নয়। এটি একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস বদলে যাওয়ার গল্প। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ডিআর কঙ্গো শুধু জয়ই পায়নি, নিজেদের নাম লিখিয়েছে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাসেও।


সম্পর্কিত নিউজ