কেনের রেকর্ডে পানামাকে হারিয়ে শীর্ষে ইংল্যান্ড

কেনের রেকর্ডে পানামাকে হারিয়ে শীর্ষে ইংল্যান্ড
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে দীর্ঘ সময় হতাশার মধ্যে থাকা ইংল্যান্ডকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করলেন জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেন। টানা তিন অর্ধে গোলহীন থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে পানামাকে ২-০ গোলে হারিয়েছে থমাস টুখেলের দল। এই জয়ে ‘এল’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে থ্রি লায়ন্সরা।

ইস্ট রাদারফোর্ডের নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটির আগে ইংল্যান্ডের সামনে ছিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। ড্র করলেও নকআউট নিশ্চিত ছিল, কিন্তু শীর্ষস্থান ধরে রাখতে জয় প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে আগেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হওয়া পানামা সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে মাঠে নেমেছিল।

 

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের কাছে রাখে ইংল্যান্ড। তবে বল দখলে এগিয়ে থাকলেও আক্রমণে ধার ছিল না। জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, মার্কাস রাশফোর্ড এবং হ্যারি কেনকে নিয়ে আক্রমণ সাজালেও পানামার রক্ষণভাগ ভাঙতে হিমশিম খেতে হয় ইংলিশদের।

 

১১ মিনিটে প্রথম সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। মার্কাস রাশফোর্ড বক্সের বাইরে থেকে শট নিলেও গোলরক্ষক অরল্যান্ডো মস্কেরা বল আটকে দেন। কিছুক্ষণ পর বেলিংহামের দূরপাল্লার আরেকটি প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

 

প্রথমার্ধে পানামাও বেশ কয়েকবার ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলে। হোসে লুইস রদ্রিগেজ দ্রুত পাল্টা আক্রমণে এগিয়ে গিয়ে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরীক্ষায় ফেলেন। পরে এডগার বারসেনাসের একটি শটও অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পানামার রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক ইংল্যান্ডকে বেশ ভুগিয়েছে।

 

প্রথম ৪৫ মিনিট গোলশূন্য শেষ হলে গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ইংলিশ সমর্থকের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। এর আগের ম্যাচে ঘানার বিপক্ষেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি ইংল্যান্ড। ফলে টানা তিন অর্ধে গোল না পাওয়ার চাপও তৈরি হয় দলের ওপর।

 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ম্যাচের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে টুখেলের দল। ৫৮ মিনিটে আরেকটি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। ডানপ্রান্তের ডিফেন্ডার জারেল কোয়ানসা চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। রিস জেমস আগেই ইনজুরিতে থাকায় ইংল্যান্ডের রক্ষণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।

 

অবশেষে ৬২ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। বুকায়ো সাকার কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের ভেতরে দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন জুড বেলিংহাম। পানামার ডিফেন্ডার হোর্হে গুতিয়েরেজকে পাশ কাটিয়ে নিচু শটে বল জালে পাঠিয়ে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার।

 

মাত্র পাঁচ মিনিট পর আবারও আঘাত হানে ইংল্যান্ড। ৬৭ মিনিটে বাম দিক থেকে জুড বেলিংহামের নিখুঁত ক্রস পেয়ে কাছ থেকে হেডে গোল করেন হ্যারি কেন। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের ১১তম গোল করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এতে গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ড ভেঙে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন তিনি।

 

জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল কেনের ৮২তম গোল। ১১৭ ম্যাচে এই গোলসংখ্যা তাঁকে ইংল্যান্ড ফুটবলের অন্যতম সেরা কিংবদন্তির কাতারে নিয়ে গেছে। গোলের পর পুরো স্টেডিয়ামে করতালিতে ভেসে যান তিনি।

 

ম্যাচের শেষ দিকে আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে। বদলি হিসেবে মাঠে নামেন জর্ডান হেন্ডারসন। এর মাধ্যমে ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবলার হিসেবে চারটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।

 

পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ডের দখলে ছিল বলের বেশির ভাগ সময়। তবে পানামাও মোট ১৩টি শট নিয়ে ইংলিশ রক্ষণকে বেশ কয়েকবার সমস্যায় ফেলে। এই পরিসংখ্যান টমাস টুখেলের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নকআউট পর্বে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন রক্ষণাত্মক দুর্বলতা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

 

ম্যাচ শেষে টমাস টুখেল বলেন, দল জিতেছে এবং গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কিন্তু নকআউটে আরও ভালো খেলতে হবে। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারারও মন্তব্য করেন, এই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে বেলিংহাম ও কেনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

 

অন্যদিকে জুড বেলিংহামকে ম্যাচসেরা হিসেবে বিবেচনা করছে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। গোল ও অ্যাসিস্টের পাশাপাশি মাঝমাঠে তাঁর নেতৃত্ব এবং আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা ইংল্যান্ডকে জয়ের পথে নিয়ে গেছে। নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ম্যাচের পর গ্যালারিজুড়ে ‘হে জুড’ ধ্বনি শোনা যায়।

 

এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এল’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইংল্যান্ড। ক্রোয়েশিয়া ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে উঠেছে। ঘানা সেরা তৃতীয় দল হিসেবে টিকে গেছে। অন্যদিকে তিন ম্যাচেই হেরে বিশ্বকাপ শেষ করেছে পানামা।

 

এখন শেষ ৩২-এ ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ডিআর কঙ্গো। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই ম্যাচে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে টমাস টুখেলের দলকে। তবে নিউইয়র্ক–নিউ জার্সির এই রাতে সবচেয়ে বড় খবর একটাই-হ্যারি কেন নতুন ইতিহাস গড়েছেন, আর জুড বেলিংহাম আবারও প্রমাণ করেছেন, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখন তিনিই।


সম্পর্কিত নিউজ