গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ায় উরুগুয়ে দলের চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল

গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ায় উরুগুয়ে দলের চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়েছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। স্পেনের কাছে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ১-০ গোলে হারের পর শুধু বিশ্বকাপ থেকেই বিদায় নেয়নি দলটি, এরপর শুরু হয়েছে নতুন বিতর্কও। উরুগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এইউএফ) আগে থেকে নির্ধারিত চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে। ফলে খেলোয়াড়দের এখন আলাদাভাবে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে হচ্ছে।

উরুগুয়ের সংবাদমাধ্যম এল পাইস ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক টেনফিল্ড জানিয়েছে, দলটির বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মেক্সিকোতে থাকা বেস ক্যাম্প থেকে পুরো দলকে একসঙ্গে মন্টেভিডিওতে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হওয়ার পর সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।

 

বিশ্বকাপের ‘এইচ’ গ্রুপে স্পেন, কেপ ভার্দে ও সৌদি আরবের সঙ্গে ছিল উরুগুয়ে। কাগজে-কলমে গ্রুপের অন্যতম ফেবারিট ছিল মার্সেলো বিয়েলসার দল। ফেদেরিকো ভালভার্দে, দারউইন নুনিয়েস, রোনাল্ড আরাউহো, ম্যানুয়েল উগার্তে ও জর্জিয়ান ডি আরাসকায়েতার মতো তারকাদের নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল সমর্থকদের। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

 

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে। ম্যাচটিতে বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থেকেও গোলের দেখা পায়নি তারা। দারউইন নুনিয়েস ও ভালভার্দে কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করলেও সৌদি গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

 

প্রথম ম্যাচে ড্রয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে জয় পাওয়ার চাপ ছিল উরুগুয়ের ওপর। কিন্তু সেই ম্যাচেও হতাশ হতে হয় তাদের। ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে দারুণ সংগঠিত ফুটবল খেলতে থাকে। ম্যাচের একপর্যায়ে পিছিয়ে পড়লেও পরে সমতায় ফেরে তারা। শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলের ড্রয়ে শেষ হয় ম্যাচটি।

 

এই ম্যাচে উরুগুয়ের হয়ে গোল করেছিলেন দারউইন নুনিয়েস ও জর্জিয়ান ডি আরাসকায়েতা। অন্যদিকে কেপ ভার্দে ম্যাচে ফিরে আসে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং সেট পিস থেকে। এই ড্রয়ের ফলে শেষ ম্যাচের আগে কঠিন সমীকরণের সামনে পড়ে যায় উরুগুয়ে।

 

গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না। কিন্তু গুয়াদালাহারায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে শুরু থেকেই ছন্দে ছিল স্পেন। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল এবং আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য দেখায় ইউরোপের দলটি।

 

ম্যাচের ৪২ মিনিটে অ্যালেক্স বায়েনার গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। দূরপাল্লার শট সামলাতে ব্যর্থ হন উরুগুয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরা। গোলটি হজমের পর প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই চোট ও পারফরম্যান্সজনিত কারণে মুসলেরাকে তুলে নেন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা।

 

দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও স্পেনের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি উরুগুয়ে। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে আগুস্তিন কানোবিও লাল কার্ড দেখলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের হার নিয়েই মাঠ ছাড়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি।

 

তিন ম্যাচে কোনো জয় না পাওয়া উরুগুয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে। সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, কেপ ভার্দের সঙ্গে ২-২ ড্র এবং স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হার-এই তিন ম্যাচে তারা মোট দুটি গোল করেছে এবং তিনটি গোল হজম করেছে।

 

গ্রুপ ‘এইচ’-এ স্পেন ৭ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সমান ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়েছে কেপ ভার্দে। গোল ব্যবধান ও অন্যান্য হিসাবের কারণে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে উরুগুয়ে। সৌদি আরবও ২ পয়েন্ট পেলেও নিচে অবস্থান করেছে।

 

এবার নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিল উরুগুয়ে। ২০২২ সালেও তারা প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারেনি। ফলে দেশটির ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

 

বিশেষ করে কোচ মার্সেলো বিয়েলসার কৌশল নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, দলের আক্রমণভাগে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য ছিল না। দারউইন নুনিয়েস পুরো টুর্নামেন্টে নিজের সেরাটা দিতে পারেননি। ভালভার্দেও মাঝমাঠে প্রত্যাশিত প্রভাব রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

 

উরুগুয়ের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়দের মধ্যেও হতাশা তৈরি করেছে। কারণ বিশ্বকাপের মতো বড় আসর থেকে বিদায়ের পর দল হিসেবে একসঙ্গে দেশে ফেরার সুযোগটিও তারা পাচ্ছেন না। কেউ সরাসরি ইউরোপে নিজেদের ক্লাবে ফিরছেন, কেউ আবার উরুগুয়েতে যাচ্ছেন।

 

মার্সেলো বিয়েলসার ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন আলোচনা শুরু হয়েছে। কোপা আমেরিকার আগে দলের পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে মনে করছেন দেশটির সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকেরা।

 

১৯৩০ ও ১৯৫০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে একসময় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে তাদের ধারাবাহিকতা কমে গেছে। ২০১০ সালে সেমিফাইনাল, ২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছালেও গত দুই বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি।

 

এই বিশ্বকাপে মাত্র দুটি গোল, কোনো জয় নয়, মাত্র দুই পয়েন্ট এবং শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়-উরুগুয়ের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে হতাশাজনক বিশ্বকাপ অধ্যায়গুলোর একটি। আর সেই হতাশার প্রতিফলনই যেন দেখা গেল চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায়।

 

বিশ্বকাপ শেষ হলেও এখন উরুগুয়ের সামনে বড় প্রশ্ন একটাই-পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করবে তারা, নাকি এই ব্যর্থতার দায়ে আবারও পরিবর্তনের পথে হাঁটবে দেশের ফুটবল কর্তারা।


সম্পর্কিত নিউজ