দোকানে দোকানে ঘুরেও মিলছেনা সয়াবিন তেল, সিন্ডিকেটের কবলে সাধারণ জনগণ?

দোকানে দোকানে ঘুরেও মিলছেনা সয়াবিন তেল, সিন্ডিকেটের কবলে সাধারণ জনগণ?
ছবির ক্যাপশান, সয়াবিন তেল সংকট

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দোকানে দোকানে খুঁজেও মিলছে না সয়াবিন তেল। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের এমন সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মুদি দোকানেই সয়াবিন তেলের বোতল নেই। যেসব দোকানে আছে, সেগুলোতেও একাধিক বোতল কিনতে দেওয়া হচ্ছে না। বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেশে ভোজ্যতেলের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৪ থেকে ৩০ লাখ টনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। এর মধ্যে সয়াবিন তেল অন্যতম প্রধান অংশ দখল করে আছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মোট চাহিদার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই সয়াবিন তেল, যা পরিমাণে বছরে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ লাখ টন। তুলনামূলক কম দাম এবং সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সয়াবিন তেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে দেশের নিজস্ব উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। মোট ভোজ্যতেলের চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ফলে বাকি ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ তেল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। আমদানিকৃত সয়াবিন বীজ প্রক্রিয়াজাত করে তেল উৎপাদন এবং সরাসরি অপরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে সয়াবিন তেলের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন তেল আমদানি হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার টনে। অর্থাৎ, আমদানিতে ৪০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

মিরপুর এলাকার এক ক্রেতা জানান, সকাল থেকে অন্তত পাঁচটি দোকানে ঘুরেছেন, কিন্তু কোথাও সয়াবিন তেল পাননি। শেষে বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলা তেল কিনতে হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মোহাম্মদপুর ও আগারগাঁও এলাকার আরও কয়েকজন ক্রেতা।

বিক্রেতারা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে সরবরাহ অনিয়মিত। এক দোকানি বলেন, “আগে যেখানে প্রতিদিন তেল আসত, এখন দুই-তিন দিন পরপর আসছে। তাও খুব কম পরিমাণে। ফলে সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।” এদিকে পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামা, এলসি খোলার সমস্যা এবং ডলারের সংকটসহ নানা কারণে তেলের আমদানি কমেছে।

ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মজুত করে বাজারে ঘাটতি তৈরি করছেন, যাতে পরে বেশি দামে বিক্রি করা যায়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, সরকার আগেও সয়াবিন তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই উদ্যোগের প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন ভোক্তারা।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক না হলে এবং নিয়মিত মনিটরিং না বাড়ালে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তারা দ্রুত আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাজারে তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। রান্নার অপরিহার্য উপকরণ হওয়ায় সয়াবিন তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্রেতাদের আশা, দ্রুত বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং এই ভোগান্তি কমবে। অন্যথায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এই সংকট দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।


সম্পর্কিত নিউজ