দেশে আবারও বাড়ল ডলারের দাম

দেশে আবারও বাড়ল ডলারের দাম
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আবারও বেড়েছে মার্কিন ডলারের দাম। ফলে আমদানিকারকদের পাশাপাশি ব্যাংকের গ্রাহকদেরও আগের তুলনায় বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে।

রোববার (১২ জুলাই) দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে গড়ে ডলারের দাম ১৩ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও গ্রাহকদের কাছে ডলার বিক্রির মূল্য সমন্বয় করেছে।

 

সর্বশেষ হিসাবে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে প্রতি মার্কিন ডলার বিক্রি করছে। এর আগে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এর আগে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় স্থিতিশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সমন্বয়ের ফলে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মার্কিন মুদ্রার বিনিময় হার।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় ধীরে ধীরে বিনিময় হারকে বাজারনির্ভর করার নীতির কারণে ভবিষ্যতেও ডলারের দামে সীমিত ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

 

এশিয়ার লেনদেনে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলারের মূল্য ০.২ শতাংশ বেড়ে ১৬২.০৭৫ ইয়েনে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইউরোর দর ০.১ শতাংশ কমে ১.১৩৯৭ ডলারে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড ০.২ শতাংশ কমে ১.৩৩৭৪ ডলারে নেমে এসেছে।

 

এছাড়া অস্ট্রেলীয় ডলার ০.৩ শতাংশ কমে ০.৬৯২৮ মার্কিন ডলার এবং নিউজিল্যান্ড ডলার ০.১ শতাংশ কমে ০.৫৭৫৭ মার্কিন ডলারে লেনদেন হয়েছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উত্তেজনা ডলার ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। তেলের দাম আরও বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে, যার ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

 

সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত দুই দফা সুদের হার বাড়াতে পারে-এমন সম্ভাবনা বেড়ে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। কয়েক দিন আগেও এই সম্ভাবনা ছিল ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

 

বিশ্বের ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান পরিমাপক ডলার সূচক (ডলার ইনডেক্স) ০.১ শতাংশ বেড়ে ১০১.১৩-এ উঠেছে, যা ৮ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ অবস্থান।

 

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাজারপ্রধান থমাস ম্যাথিউস বলেন, আগের মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময় নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। তবে এবার ডলার আগেই অনেকটা শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় নতুন সংঘাত আরও তীব্র হলেও আগের মতো বড় উল্লম্ফন নাও দেখা যেতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্যের দিকে। মঙ্গলবার দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) এবং বুধবার উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বক্তব্যও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

 

অন্যদিকে, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারেও। সর্বশেষ লেনদেনে বিটকয়েনের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৬২ হাজার ৭৯০ ডলারে এবং ইথারের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৭৯ ডলারে নেমে এসেছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের খরচও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বাড়লে ডলারের বাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।


সম্পর্কিত নিউজ