কী নেই চবির মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে - প্রতিমন্ত্রীর ফেস্টুন থেকে রিকশাচালকদের পোস্টার!

কী নেই চবির মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে - প্রতিমন্ত্রীর ফেস্টুন থেকে রিকশাচালকদের পোস্টার!
ছবির ক্যাপশান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে গেছে ব্যানার-পোস্টারে | ছবি: জাগরণ নিউজ
  • Author, আল আরাফ, চবি প্রতিনিধি
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থাপনাগুলো এখন যেন হারিয়ে ফেলছে তাদের মর্যাদা। স্মরণ চত্বর থেকে শুরু করে শহীদ মিনার ও বিজয় ’৭১ চত্বর, সবখানেই দেখা মিলছে রাজনৈতিক ফেস্টুন, সংগঠনের ব্যানার, এমনকি রিকশাচালকদের পোস্টার পর্যন্ত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এসব স্মৃতিস্তম্ভের প্রতি কতটা শ্রদ্ধা ও যত্ন দেখানো হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। জিরো পয়েন্টে অবস্থিত ‘স্মরণ চত্বর’ এবং শহীদ মিনার সংলগ্ন ‘বিজয় ’৭১ চত্বর’ (পূর্বের জয় বাংলা চত্বর) এর মধ্যে অন্যতম। এর মধ্যে স্মরণ চত্বরটি নির্মাণ করা হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের আত্মদানকারী শহীদদের স্মরণে, যেখানে শহীদদের নামও সংরক্ষিত রয়েছে। তবে অবহেলায় এই চত্বর এখন শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল ‘জিরো পয়েন্ট’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্মরণ চত্বরটি ব্যানার-ফেস্টুনে ঢেকে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দিবস, সেমিনার বা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এখানে নির্বিচারে ব্যানার টানানো হয়। বর্তমানে সেখানে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের বড় ফেস্টুন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শোকবার্তার ব্যানার, সৎসঙ্গ পরিষদের সরস্বতী পূজার ব্যানার এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চাকসুর ব্যানার শোভা পাচ্ছে। পাশাপাশি চত্বরের পাদদেশে ছাত্রদলের চিকা ও স্লোগানও দেখা গেছে।

এছাড়া স্মরণ চত্বরের ভেতরে সিসিটিভির খুঁটি স্থাপন করায় বৈদ্যুতিক তারে আংশিকভাবে ঢেকে গেছে পুরো এলাকা। একই চিত্র দেখা গেছে শহীদ মিনার এলাকাতেও, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি ও দিবস উপলক্ষে পোস্টার লাগানো হচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ফেস্টুনও শহীদ মিনারে ঝুলতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে, বিজয় ’৭১ চত্বরও পড়ে আছে অবহেলায়। ৫ আগস্টের পর জয় বাংলা চত্বরের নাম পরিবর্তন করে বিজয় ’৭১ রাখা হলেও, পূর্বের উপাচার্য তার কার্যকাল শেষ করলেও ভাঙা নামফলকটি এখনো পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওসামা বিন গনি বলেন, “স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস ও চেতনা তুলে ধরার জন্য। সেখানে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা কোনো দিবসের ফেস্টুন থাকা একেবারেই অনুচিত। আমরা অনেকেই জানি না এই চত্বরগুলোর প্রকৃত নাম, এটা দুঃখজনক।”

অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইসরাফিল সাগর বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী এসব স্মৃতিস্তম্ভের নাম জানে না। প্রশাসনের উচিত এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা, প্রয়োজনে আলোকসজ্জার মাধ্যমে দৃশ্যমানতা বাড়ানো।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমি ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্টদের এসব ব্যানার ও ফেস্টুন দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. সরওয়ার্দী বলেন, “আমি এখনই লোক পাঠাচ্ছি, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

চাকসুর সমাজসেবা ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক তাহসিনা রহমান বলেন, “স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে ব্যানার-ফেস্টুন না লাগাতে আমরা সংগঠনগুলোকে বলেছি। স্মরণ চত্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিষয়টি বেশি দৃশ্যমান। আমরা প্রক্টরের সঙ্গে পরিদর্শনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব এবং এসব স্থাপনার মর্যাদা রক্ষায় কাজ করব।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর এই অবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই শুধু নয়, সচেতন মহলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই নিদর্শনগুলো আরও আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ