হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯৩৮ জন

হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯৩৮ জন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে শতাধিক রোগীর শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় এক হাজার মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এতে চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবের পর মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৮ জনে।

রোববার (২৯ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টার তথ্য প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন। তাদের মধ্যে ৮৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ১১৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। অপর একজন অন্য একটি বিভাগের। যদিও মৃতদের সবার ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়নি, তবে তারা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

 

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৯৫ জন। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৬৯৩ জনের। সব মিলিয়ে চার মাসের কিছু বেশি সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮৮ জনে, যা দেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

 

একই সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৩৭ জনে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।

 

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৩০২ জন। এরপর সিলেটে ৯৮ জন, রাজশাহীতে ৮৯ জন, ময়মনসিংহে ৬৬ জন, চট্টগ্রামে ৫৫ জন, বরিশালে ৪৩ জন, খুলনায় ৩১ জন এবং রংপুর বিভাগে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 

হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাতেও এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪০ হাজার ২৭৩ জন, যা মোট ভর্তি রোগীর প্রায় ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ২০ হাজার ৮৭ জন রোগী। এছাড়া সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর বিভাগেও আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়া, কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহা এবং সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়ার কারণেই সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

তারা আরও বলেন, শুধু টিকাদানই নয়, কার্যকর রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশনের ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে হামের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতরও অভিভাবকদের প্রতি শিশুদের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বর, শরীরে লালচে র‍্যাশ, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বর্ষা মৌসুমে সংক্রামক রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই ব্যক্তি, পরিবার এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এনে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে।


সম্পর্কিত নিউজ