{{ news.section.title }}
ভারতীয়দের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করল যুক্তরাষ্ট্র
কনস্যুলার কার্যক্রম আরও আধুনিক, দ্রুত ও কার্যকর করতে ‘America First’ নামে নতুন একটি ভিসা শিডিউলিং টুল চালুর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ভারতে চার দিনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরের সময় নয়াদিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নতুন সাপোর্ট অ্যানেক্স ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই ঘোষণা দেন।
নতুন এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো-যেসব ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীর সফর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে, তাদের ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণে অগ্রাধিকার দেওয়া। ভারত টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুবিও শনিবার নতুন “America First visa scheduling tool” ঘোষণা করেন, যা ব্যবসায়িক পেশাজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বহুদিনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এটি এমনভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, যা সব সময় সংবাদ শিরোনামে আসে না। তার ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত সহযোগিতায়ও তা গভীর হচ্ছে।
কারা অগ্রাধিকার পাবেন
নতুন টুলের মূল নীতি হলো-যেসব আবেদনকারীর সফর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সরাসরি ভূমিকা রাখবে, তারা আগে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বাস্তবে এর আওতায় থাকতে পারেন ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন করতে যাওয়া প্রতিনিধি, বিনিয়োগ আলোচনায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তা, যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম সম্প্রসারণে যাওয়া কোম্পানি কর্মকর্তা, প্রযুক্তি পেশাজীবী, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।
NDTV–র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই টুল ব্যবসায়ী ও এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেবে, যাদের সফর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যবসায়িক সফর, বিনিয়োগসংক্রান্ত ভ্রমণ এবং অংশীদারিত্বমূলক বৈঠকের মতো কার্যক্রমে ধীর বা অনিশ্চিত কনস্যুলার প্রক্রিয়া বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে-এই জটিলতা কমাতেই নতুন ব্যবস্থা আনা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুবিধা ভিসা অনুমোদনের নিশ্চয়তা নয়। এটি মূলত সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণে অগ্রাধিকার দিতে পারে। ভিসা অনুমোদন হবে বিদ্যমান মার্কিন অভিবাসন আইন, নিরাপত্তা যাচাই, আবেদনকারীর যোগ্যতা ও কনস্যুলার কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
২০ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় বিনিয়োগের প্রসঙ্গ
রুবিও তার বক্তব্যে বলেন, ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও উৎপাদন খাতে ভূমিকা রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। NDTV–র প্রতিবেদনে রুবিওর বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, ভারতীয় কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে দুই দেশের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বও জোরদার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ভারত এখন শুধু একটি বড় বাজার নয়, বরং প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সেই প্রেক্ষাপটে ভিসা প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
কনস্যুলার ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা
রুবিও বলেন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ কনস্যুলার ব্যবস্থা এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে জরুরি। তার মতে, ধীরগতির প্রক্রিয়া ব্যবসায়িক সফর, বিনিয়োগ বৈঠক ও অংশীদারিত্বমূলক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। নতুন টুলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো প্রয়োজনীয় কাজ আরও নির্ভুলভাবে, দ্রুত এবং কার্যকরভাবে করতে পারবে।
ভারত টুডের প্রতিবেদনে রুবিওর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থা কনস্যুলার সেবা আধুনিকীকরণ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। তিনি আরও বলেন, নতুন সুবিধা আমেরিকানদের অর্থ সাশ্রয় করবে, কারণ এটি কাজকে আরও দক্ষ করে তুলবে।
রুবিও শুধু ভিসা আবেদনকারীদের কথাই বলেননি; তিনি যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ও কনস্যুলেটে কর্মরত কনস্যুলার কর্মকর্তা, সহায়ক কর্মী এবং প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নিতে কাজ করা কর্মীদেরও প্রশংসা করেন। তাদের তিনি সামনের সারির কর্মী হিসেবে উল্লেখ করেন।
কঠোর যাচাইও থাকবে
নতুন টুল ব্যবসায়িক আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দিলেও নিরাপত্তা যাচাই শিথিল করা হবে-এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোর screening ও vetting বজায় থাকবে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থায় কড়া যাচাই-বাছাই ও নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরও বলেছেন, নতুন কনস্যুলার সুবিধা “rigorous vetting, processing and screening” উন্নত করতে সহায়তা করবে।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে প্রতিটি ভিসা সিদ্ধান্ত জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও আবেদনকারীদের পরিচয়, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আইনগত যোগ্যতা আগের মতোই যাচাই করা হবে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বার্তা
এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও অভিবাসন ইস্যুতে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। ভারতীয় পেশাজীবী, প্রযুক্তি কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের প্রধান গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা ফি, H-1B, শিক্ষার্থী ভিসা ও নিরাপত্তা যাচাই নিয়ে নানা আলোচনার কারণে দুই দেশের মধ্যে অভিবাসন ও mobility ইস্যু সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
ভারত টুডে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতি পরিবর্তন এবং H-1B ভিসা ফি বাড়ানো ভারতীয় পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রুবিওর ঘোষণা ভারতীয় ব্যবসা ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য একটি আশ্বাসের বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য কী অর্থ দাঁড়ায়
নতুন ‘America First’ টুল মূলত ব্যবসায়িক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আবেদনকারীদের দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট সুবিধা দিতে পারে। তবে পর্যটক, শিক্ষার্থী বা সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কী পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কার্যপদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অফিসিয়াল ভিসা তথ্য পোর্টাল Travel.State.Gov–এ বলা আছে, বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য সাধারণত ভিসা প্রয়োজন হয় এবং ভিসার ধরন নির্ভর করে ভ্রমণের উদ্দেশ্যের ওপর। একই পোর্টালে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের সাধারণত নিজের বসবাসের দেশ বা নাগরিকত্বের দেশের মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করতে হবে।
তাই আবেদনকারীদের জন্য পরামর্শ হলো-শুধু নতুন টুলের খবর শুনে কোনো অননুমোদিত এজেন্ট বা দ্রুত ভিসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে নির্ভর না করে, অফিসিয়াল মার্কিন ভিসা ওয়েবসাইটের নির্দেশনা অনুসরণ করা। ভিসা আবেদন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ফি ও প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য সবসময় মার্কিন দূতাবাস, কনস্যুলেট বা Travel.State.Gov থেকে যাচাই করা উচিত।
‘America First’ ভিসা শিডিউলিং টুল যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলার ব্যবস্থায় একটি নতুন অগ্রাধিকারভিত্তিক পদ্ধতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন বোঝাতে চাইছে-যেসব সফর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও কৌশলগত সম্পর্ককে এগিয়ে নেবে, সেগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে দিতে চায় তারা।
তবে এই উদ্যোগের সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তা যাচাইও থাকবে। তাই এটি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তির খবর হলেও ভিসা অনুমোদনের নিশ্চয়তা নয়। কার্যকর নিয়ম, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং কোন ক্যাটাগরির আবেদনকারীরা কীভাবে অগ্রাধিকার পাবেন-এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশের পরই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।