বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও ভারতে বাড়লো দাম

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও ভারতে বাড়লো দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমলেও প্রতিবেশী ভারতীয় বাজারে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকটের প্রভাব দেখিয়ে ভারতে আবারও পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো। সোমবার (২৫ মে) নতুন করে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ২ রুপি ৬১ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ২ রুপি ৭১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। Reuters জানিয়েছে, এটি প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে ভারতের জ্বালানি দামে চতুর্থ দফা বৃদ্ধি।

সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ফলে রাজধানী নয়াদিল্লিতে পেট্রলের দাম ১০০ রুপির ঘর ছাড়িয়ে ১০২.১২ রুপিতে পৌঁছেছে। ডিজেলের দামও বেড়ে হয়েছে ৯৫.২০ রুপি। ভারতের বড় চার মহানগর-নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাই-সবখানেই পেট্রল-ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় দুই রুপির বেশি বেড়েছে।

 

ভারতের বড় শহরগুলোতে পেট্রলের নতুন দাম

সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর ভারতের চার প্রধান মহানগরে 

 

পেট্রলের দাম দাঁড়িয়েছে-

নয়াদিল্লি: ১০২.১২ রুপি, বেড়েছে ২.৬১ রুপি
কলকাতা: ১১৩.৫১ রুপি, বেড়েছে ২.৮৭ রুপি
মুম্বাই: ১১১.২১ রুপি, বেড়েছে ২.৭২ রুপি
চেন্নাই: ১০৭.৭৭ রুপি, বেড়েছে ২.৪৬ রুপি

 

ডিজেলের নতুন দাম-

নয়াদিল্লি: ৯৫.২০ রুপি, বেড়েছে ২.৭১ রুপি
কলকাতা: ৯৯.৮২ রুপি, বেড়েছে ২.৮০ রুপি
মুম্বাই: ৯৭.৮৩ রুপি, বেড়েছে ২.৮১ রুপি
চেন্নাই: ৯৯.৫৫ রুপি, বেড়েছে ২.৫৭ রুপি

এবিপি লাইভ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ মে ভারতের চার প্রধান মহানগরেই এই নতুন দর কার্যকর হয়েছে। মুম্বাই ও কলকাতায় পেট্রলের দাম ১১০ রুপির ওপরে রয়েছে, আর চেন্নাইতেও পেট্রল ১০৭ রুপির বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

 

এদিকে শুধু পেট্রল-ডিজেল নয়, দিল্লিতে সিএনজির দামও বেড়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে সিএনজির দাম কেজিপ্রতি এক রুপি বাড়িয়ে ৮১.০৯ রুপি করা হয়েছে। এর আগে ১৫ মে ও ১৭ মে-তেও সিএনজির দাম বাড়ানো হয়েছিল।

 

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ভারতে কেন বাড়ছে

সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে বলে Reuters জানিয়েছে। একই সময়ে মার্কিন WTI ক্রুডের দামও কমে যায়।

 

তবে ভারতের খুচরা বাজারে দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে আগের কয়েক সপ্তাহের আমদানি ব্যয় ও তেল কোম্পানিগুলোর লোকসানকে দেখানো হচ্ছে। Reuters জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি-ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম-দীর্ঘ সময় দেশের বাজারে দাম ধরে রেখেছিল। এই তিন কোম্পানি ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি বিক্রয়কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে।

 

অর্থাৎ সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও ভারতের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি মূলত আগের উচ্চ আমদানি ব্যয় ও আন্ডার-রিকভারি বা লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার অংশ। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ভারতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম মোট প্রায় সাড়ে ৭ রুপি করে বেড়েছে।

 

দুই সপ্তাহে চার দফা দাম বাড়ল

ভারতে ১৫ মে প্রথম দফায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ রুপি করে বাড়ানো হয়। এরপর ১৯ মে আবার ৯০ পয়সা, ২৩ মে পেট্রলে ৮৭ পয়সা ও ডিজেলে ৯১ পয়সা এবং ২৫ মে নতুন করে দুই রুপির বেশি দাম বাড়ানো হয়। Devdiscourse–এর প্রতিবেদনে এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ভারতে ২০২২ সালের এপ্রিলের পর দীর্ঘ সময় খুচরা জ্বালানির দাম স্থিতিশীল ছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে পেট্রল-ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ রুপি কমানোও হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আবার দফায় দফায় দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে Reuters-এর আগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

 

সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ

জ্বালানি তেলের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পেট্রলের দাম বাড়লে ব্যক্তিগত যানবাহন ও শহুরে যাতায়াত ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন, কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, জ্বালানি দামের এমন বৃদ্ধি পরিবারগুলোর বাজেটে চাপ বাড়াবে এবং পরিবহন খরচেও প্রভাব ফেলবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বড় তেল আমদানিকারক দেশের জন্য জ্বালানি মূল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল বিষয়। সরকারকে একদিকে তেল বিপণন সংস্থাগুলোর আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপও বিবেচনা করতে হয়।

 

বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলারের নিচে নামলেও ভারতের সাধারণ ভোক্তাদের এখনই স্বস্তি মিলছে না। ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকট, আগের উচ্চ আমদানি ব্যয়, রুপির বিনিময় হার এবং তেল কোম্পানিগুলোর লোকসান-সব মিলিয়ে ভারতীয় বাজারে পেট্রল-ডিজেলের দাম আবারও বেড়েছে। ফলে পরিবহন খরচ, বাজারদর ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ