{{ news.section.title }}
‘ককরোচ জনতা পার্টির’ রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, কী বলছে তারা?
ভারতে ব্যঙ্গাত্মক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। শুরুতে এটি ছিল মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি বিদ্রূপধর্মী উদ্যোগ। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটির তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে প্ল্যাটফর্মটি। এবার নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে জানিয়েছে সিজেপি।
গতকাল রোববার ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে নিজেদের উদ্দেশ্য ও অবস্থান তুলে ধরে সংগঠনটি। পোস্টটির শিরোনাম ছিল-‘ককরোচ বা তেলাপোকারা সবে যাত্রা শুরু করেছে’। সেখানে বলা হয়, তাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তরুণদের কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী করতে তরুণদের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন আন্দোলন গড়ে তোলা।
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও শেষ পর্যন্ত তেলাপোকা টিকে থাকতে পারে-অন্ধকার ফাঁকফোকরে দিব্যি বেঁচে থাকে এবং তাদের শেষ করার সব প্রচেষ্টাকেই তারা পেরিয়ে যায়। এ দেশে তরুণদের অনেকটা এমনই মনে হয়-অবহেলিত, অবমূল্যায়িত ও উপেক্ষিত, কিন্তু তবু কখনো তাঁরা জীবনের আশা ছাড়েন না।’
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ মে। এক মামলার শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ শব্দ ব্যবহার করেন। আদালতে একজন আইনজীবীকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো। তারা কোনো কাজ পায় না, পেশায় কোনো জায়গা পায় না। তাদের কেউ মিডিয়া হয়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া বা আরটিআই কর্মী হয়ে সবাইকে আক্রমণ শুরু করে।’
এই মন্তব্য ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। এর ঠিক পরদিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এই প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। যদিও পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান, তাঁর মন্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কথাগুলো মূলত ভুয়া ও জাল ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল।
সিজেপি চালুর কয়েক দিনের মধ্যেই অনলাইনে এর জনপ্রিয়তা বিস্ফোরণের মতো বাড়তে থাকে। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২৮ লাখ ছাড়িয়েছে। অসংখ্য তরুণ এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হলেও শুরু থেকেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল-এটি কি শুধুই আরেকটি ভাইরাল মিম পেজ হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এবার নিজেরাই দিয়েছে সিজেপি।
পোস্টে সিজেপি বলেছে, এই আন্দোলনের নজিরবিহীন উত্থান একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে-সেটি হলো, ভারতের তরুণেরা তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।
একই পোস্টে দলটি অভিযোগ করে জানায়, তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার ‘অবিরাম চেষ্টা’ চলছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে ‘কুৎসা রটনাও’ করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। এসব ঘটনাকে তারা ‘দুর্ভাগ্যজনক, তবে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়’ বলে উল্লেখ করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে পোস্টে আরও বলা হয়েছে, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই-তরুণদের উদ্বেগ ও দাবি তুলে ধরা এবং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনাকে কেন্দ্র করে আমরা তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই।আমাদের মূল্যবোধ ভারতের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ দেশ গড়ার পেছনে থাকা নেতা-গান্ধী, আম্বেদকর, নেহরু, শহীদ ভগত সিং ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি।
‘আমাদের মূল বিশ্বাস খুবই সরল-শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশগত সমস্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম আরও ভালো কিছু প্রাপ্য।’

তবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি সমালোচনার মুখেও পড়েছে সিজেপি। রাজা চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি রোববার সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করে দলটির বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধান বিচারপতির আদালতের মৌখিক মন্তব্যকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
অন্যদিকে, সিজেপির নাম ব্যবহার করে অনলাইনে প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে। পাঞ্জাব পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সতর্কবার্তা দিয়ে জানায়, হোয়াটসঅ্যাপে সিজেপির নামে বিভিন্ন লিংক পাঠিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে। এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে লুধিয়ানা পুলিশের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, এটি নিছক মজার বিষয় নয়। ওই ভিডিও সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, ‘আপনি এই লিংকে ক্লিক করলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার ফোন হ্যাক হয়ে যাবে এবং আপনার সব ব্যাংকিং তথ্য প্রতারকদের কাছে চলে যাবে।’
এদিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের পরিবারের বাড়ির বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক রিলেশনস বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ পুনে থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তাঁর বাবা-মা ভারতের মহারাষ্ট্রে বসবাস করেন। ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে তাঁদের বাড়ির সামনে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা দেওয়া হচ্ছে।
উপপুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) পঙ্কজ অতুলকর বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পঙ্কজ আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে সিজেপি বিষয়টি ট্রেন্ডিং থাকায় সেখানে যাতে ভিড় না জমে, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক হুমকির অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা দিপকে পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে ও ভারতে থাকা আমার পরিবারকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি একটি ভিডিও পেয়েছি, যেখানে এক ব্যক্তি বলছে, তারা আমার বাড়ির বাইরে পৌঁছে গেছে।’
অভিজিতের বাবা ভগবান একটি মারাঠি নিউজ চ্যানেলকে বলেন, ‘আমি দুই রাত ধরে ঘুমাতে পারিনি। আমি চিন্তিত; কারণ, অভিজিৎ এখন পরিচিত হয়ে গেছে। আর এমন ব্যক্তিদেরই সাধারণত গ্রেপ্তার করা হয়।’ মা আনিতা বলেন, ‘আমরা শুধু চাই, সে নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসুক। আমি এ বিষয়ে তাঁকে সমর্থন করব না।’
দিপকে আরও জানিয়েছেন, তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে, এক্স অ্যাকাউন্ট ভারতে ব্লক করা হয়েছে এবং সিজেপির ওয়েবসাইট হয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নয়তো সেখানে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে দলটির একটি ব্যাকআপ ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট চালু রয়েছে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস