সীমান্ত ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে অমিত শাহকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

সীমান্ত ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে অমিত শাহকে ঘিরে নতুন বিতর্ক
ছবির ক্যাপশান, সীমান্ত ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে অমিত শাহকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

ভারতে আবারও ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু সামনে এনে কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্যের অমিল ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছে, অনুপ্রবেশ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্য এবং সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক থাকায় বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

গুজরাটের গান্ধীনগরে এক অনুষ্ঠানে অমিত শাহ বলেন, বেআইনি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে দেশের জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে এক বছরের মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন আইন আনার বিষয়ও বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

 

পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১০ হাজার মানুষ পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করত, আর এখন সেই সংখ্যক মানুষই বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছে। এই মন্তব্যের পরই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়।

 

বিতর্কের মূল জায়গা হলো সরকারি হিসাব। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের লিখিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের পশ্চিমবঙ্গ অংশে বিএসএফ ২০২৩ সালে ১ হাজার ৫৪৭ জনকে আটক করে। ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ১ হাজার ৬৬৪। আর ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আটক হয় ৭২৩ জন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটত, তাহলে বছরে সেই সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছানোর কথা। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যের এই পার্থক্যই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তর নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। অমিত শাহ দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সীমান্ত সুরক্ষার জন্য দ্রুত জমি হস্তান্তর করছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৪২ দশমিক ৭৯ একর জমি বিএসএফকে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও জমি হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পশ্চিমবঙ্গের অংশটি দীর্ঘ ও জটিল। নদী, বসতি, কৃষিজমি এবং সীমান্তবর্তী গ্রামের কারণে অনেক এলাকায় বেড়া নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ অংশের বড় একটি এলাকায় এখনো সীমান্ত বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। কোথাও জমি অধিগ্রহণ বাকি, কোথাও স্থানীয় আপত্তি, আবার কোথাও ভৌগোলিক জটিলতার কারণে কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অনুপ্রবেশ ইস্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল। ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জনবিন্যাসের প্রশ্নে এই ইস্যু বারবার সামনে আসে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি আরও বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

 

বিরোধীদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে বড় করে দেখানো হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তাদের দাবি, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব মূলত কেন্দ্রীয় বাহিনীর। তাই অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুললে তার জবাবও কেন্দ্রীয় সরকারকেই দিতে হবে।

 

অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষা শুধু কেন্দ্রের দায়িত্ব নয়; রাজ্য প্রশাসনের সহযোগিতাও জরুরি। তাদের দাবি, অনুপ্রবেশ, জাল নথি, চোরাচালান ও বেআইনি বসতি রোধে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

সব মিলিয়ে অমিত শাহের সাম্প্রতিক মন্তব্য অনুপ্রবেশ ইস্যুকে আবারও ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রে এনেছে। তবে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যানের অমিল নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ