{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃহস্পতিবার (২১ মে) আবারও কিছুটা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা একদিকে ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকট, মার্কিন তেলের মজুত কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাজারে চাপ তৈরি করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার লেনদেনে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৪২ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৫০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৭৬ ডলারে লেনদেন হয়।
এর আগের সেশনে তেলের দাম বড় পতনের মুখে পড়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়ার পর বাজারে স্বস্তি তৈরি হয় এবং ব্রেন্ট প্রায় ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। তবে বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে সরবরাহ সংকট কাটছে না। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অচলাবস্থা বৈশ্বিক তেলবাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরু এবং হরমুজ প্রণালির প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তেলবাজার অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক মজুত আরও কমে যেতে পারে এবং কয়েক মাসের মধ্যে বাজার আরও তীব্র সরবরাহ সংকটে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজারে দাম ওঠানামার প্রধান কারণ দুটি-শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা এবং বাস্তব সরবরাহ সংকট। আলোচনায় অগ্রগতি হলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। কিন্তু চুক্তি না হলে বা আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ বৈশ্বিক তেলবাজারে এখন মজুতের ওপর চাপ বাড়ছে এবং বিকল্প সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো সহজ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মজুতের তথ্যও বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ১৫ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত ৭৯ লাখ ব্যারেল কমে ৪৪৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমেছে। এটি টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো মজুত কমার ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বা ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, মজুত বছরের এই সময়ের পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম।
মজুত কমার পেছনে উচ্চ রপ্তানি, পরিশোধনাগারগুলোর বেশি ব্যবহার এবং সরবরাহ সংকটের চাপকে কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। সাধারণত তেলের মজুত কমলে বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ এতে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। রয়টার্সের ওপেন ইন্টারেস্ট বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দৃশ্যমান মজুত কমার সঙ্গে তেলের দামের নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে-অর্থাৎ মজুত কমলে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট এখনও ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে উচ্চ তেলের দাম আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের রুপির ওপরও তেলের দামের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুড আগের সেশনে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের কাছাকাছি নামায় ভারতীয় রুপি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলে বাজারে প্রত্যাশা তৈরি হয়। তবে বিনিয়োগকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতির খবরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ওপেক ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কোনো স্থায়ী সমঝোতা না হলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি পূর্ণমাত্রায় চালু না হলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। একই সঙ্গে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ওপেক প্লাস এবং এশীয় ক্রেতাদের অবস্থানও বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু বর্তমান সরবরাহ নয়, আগামী কয়েক মাসের মজুত পরিস্থিতিও দেখছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শান্তি আলোচনায় বড় অগ্রগতি না হলে বৈশ্বিক তেলবাজারের হাতে হয়তো প্রায় তিন মাস সময় আছে, এরপর মজুত আরও নিচে নেমে সরবরাহ সংকট প্রকট হতে পারে। তখন দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত চাহিদা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ব্যয়, খাদ্য পরিবহন এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতির ওপর। উচ্চ তেলের দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর মুদ্রানীতির পথে হাঁটতে পারে, যা আবার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স