{{ news.section.title }}
চীন সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরে চীন যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (২১ মে) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফরের ঘোষণা দেয়। বেইজিংয়ের এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক সামলাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ঘনিষ্ঠ অবস্থান দেখাচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ২৩ থেকে ২৬ মে চীন সফর করবেন। ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহুদিনের; পাকিস্তান চীনকে তার “অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনার” হিসেবে দেখে। এই সফরে দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, ডিজিটাল সহযোগিতা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
এর আগে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছিলেন, শেহবাজের সফরে একটি ব্যবসা-বাণিজ্য ফোরামও থাকবে, যার লক্ষ্য দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডন ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, সফরে ব্যবসায়িক সম্পর্ক, ডিজিটাল অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং সিপিইসি–এর দ্বিতীয় ধাপ বা CPEC 2.0 বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
চীন সফরের আগে ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতি নিয়েও যোগাযোগ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এর আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই–এর সঙ্গে ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ সহজতর করতে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেন বলে পাকিস্তানি গণমাধ্যম জানায়। এটি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তান নিজেকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, আর এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সমন্বয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে।
শেহবাজ শরিফ এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে চীন সফর করেন। ওই সময় তিনি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও–সম্পর্কিত বৈঠকে অংশ নেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংসহ শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেন। পাকিস্তান তখনও সিপিইসি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সফর সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়; অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গভীর। সিপিইসি পাকিস্তানের অবকাঠামো, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি। তবে ঋণ, নিরাপত্তা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এবং চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলে শেহবাজের এই সফরে চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোও ইসলামাবাদের বড় লক্ষ্য হতে পারে।
এই সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠকও আন্তর্জাতিক আলোচনায় আছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, শি ও পুতিন যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, ভূমি ও মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
শি-পুতিন যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতিরও সমালোচনা করা হয়। গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে দায়ী করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়; মস্কো মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহ দেখালেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেছে রাশিয়া।
তবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে শি ও পুতিনের অবস্থান এক হলেও, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মস্কোর কাঙ্ক্ষিত বড় সাফল্য আসেনি। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে Power of Siberia 2 নামে নতুন গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি নিশ্চিত করতে চাইছে, যার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে চীনে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বড়ভাবে বাড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু বেইজিং বৈঠকে সেই চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
এই ব্যর্থতা রাশিয়া-চীন সম্পর্কের একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বাজারে প্রবেশ কমে যাওয়ায় রাশিয়া জ্বালানি রপ্তানির জন্য চীনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু চীন তার নিজস্ব দর-কষাকষির শক্তি ব্যবহার করছে এবং দ্রুত কোনো বড় পাইপলাইন চুক্তিতে যেতে আগ্রহী নয়-এমন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক ও জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ার কথা বললেও নতুন পাইপলাইন নিয়ে বড় অগ্রগতি হয়নি।
শেহবাজের চীন সফর তাই শুধু পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের ঘটনা নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং এখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প-শি বৈঠকের পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে; আবার পুতিনের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নীতির বিরোধিতা করছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সফর বেইজিংয়ের দক্ষিণ এশিয়া কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
পাকিস্তানের জন্য সফরটির গুরুত্ব আরও বেশি। দেশটি অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক ঋণ, জ্বালানি সংকট, নিরাপত্তা সমস্যা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির জটিলতার মধ্যে আছে। চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কৃষি, আইসিটি, খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা বাড়াতে পারলে ইসলামাবাদ কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তি পেতে পারে। একই সঙ্গে সিপিইসি–এর নতুন ধাপ পাকিস্তানের জন্য কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে চীনের জন্য পাকিস্তান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় প্রভাবের ভারসাম্য, আরব সাগরে প্রবেশ, গওয়াদর বন্দর, আঞ্চলিক করিডর এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় চীনের যোগাযোগ-সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তান বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাই নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও চীন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, শেহবাজের সফরে বড় কোনো চুক্তি হোক বা না হোক, দুই দেশের রাজনৈতিক বার্তা পরিষ্কার হবে-চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এখনো কৌশলগতভাবে দৃঢ়। একই সঙ্গে সফরটি দেখাবে, বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব ধরে রাখতে এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে কতটা প্রস্তুত।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স