{{ news.section.title }}
ইরান যুদ্ধের ২৫ গুণ খরচ মিলেছে ভেনেজুয়েলার তেলে: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন করে তীব্র আলোচনা তৈরি করেছে। এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া তেল ও জ্বালানি সুবিধার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এত বিপুল অর্থনৈতিক লাভ করেছে যে, সেই অর্থ দিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের ব্যয় বহুবার মেটানো সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষায়, “ভেনেজুয়েলায় আমরা খারাপ করিনি। আমরা এত বেশি তেল নিয়েছি যে, ইরান যুদ্ধের খরচ প্রায় ২৫ বার উঠে এসেছে।” এই বক্তব্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, প্রকৃত ব্যয় সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও অনেক বেশি হতে পারে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার আর্থিক প্রভাবও দ্রুত বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চাপে পড়ে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে বলে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, “তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রও প্রচুর অর্থ আয় করে।” তার এই মন্তব্য নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সমালোচনা শুরু হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলাকে শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তার প্রশাসনের সময় থেকেই ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে মার্কিন আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল ও জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে দেশটির “ধ্বংসপ্রাপ্ত জ্বালানি অবকাঠামো” পুনর্গঠনের আহ্বানও জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সংকট দেখা দেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেলকে বিকল্প উৎস হিসেবে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি স্বাধীন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে যুদ্ধ ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে এই মন্তব্যকে “সম্পদভিত্তিক আধিপত্যবাদী মানসিকতা” হিসেবে দেখছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার সম্পদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প একই বক্তব্যে ইরানকে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান অনেক দূরে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমান, পরিবহন ও জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু নির্বাচনী প্রচারণার অংশ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ও পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিতও বহন করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক তেলবাজার এবং ভেনেজুয়েলার জ্বালানি সম্পদকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কৌশল আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স