ইউরেনিয়াম ইরানেই থাকবে: শান্তি আলোচনায় তেহরানের কঠোর অবস্থান

ইউরেনিয়াম ইরানেই থাকবে: শান্তি আলোচনায় তেহরানের কঠোর অবস্থান
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা ও পারমাণবিক সমঝোতার প্রচেষ্টার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে তেহরান। ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি নির্দেশ দিয়েছেন, দেশটির কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই বিদেশে পাঠানো যাবে না। রয়টার্সকে দুইজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এই নির্দেশ চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন ও তেল আবিব চাইছে, সম্ভাব্য যে কোনো চুক্তিতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রাখা হোক।

 

ইরানি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের নেতৃত্ব মনে করছে-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো হলে ইরান আরও বেশি সামরিক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাদের যুক্তি, ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর নতুন হামলা চালাতে আরও সাহসী হতে পারে। তাই এই মজুতকে তেহরান কৌশলগত নিরাপত্তা ও দর-কষাকষির বড় হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে।

 

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের আশ্বস্ত করেছেন-ইরানের সঙ্গে যদি কোনো চুক্তি হয়, তবে সেখানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি অবশ্যই থাকবে। তাদের দাবি, চুক্তির আওতায় ইরানের ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে পাঠানোর শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে মোজতবা খামেনির নতুন নির্দেশ সেই সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাবে। ৬ মে রয়টার্সের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুদ্ধ শেষ করার আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে ওয়াশিংটন চাপ বজায় রেখেছে। কিন্তু তেহরানের নতুন অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

 

ইরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে বলে ধারণা করা হয়। পশ্চিমা ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এ পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে বলেছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম অপসারণ না করা পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে মানবেন না। তাঁর শর্তগুলোর মধ্যে আছে-ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা বন্ধ করা এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিলুপ্ত করা।

 

তবে ইরানের দৃষ্টিতে এসব শর্ত আত্মসমর্পণের সমান। তেহরান মনে করছে, পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্রদের প্রশ্নে ছাড় দিলে দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা, খামেনি হত্যাকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালি সংকটের পর ইরানি নেতৃত্ব এখন নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

 

ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি মার্চে তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হন। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস মোজতবাকে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে মনোনীত করে। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি কঠোরপন্থী অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দিকের বক্তব্যেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। রয়টার্সের মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি “শহীদদের প্রতিশোধ” এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

 

নতুন ইউরেনিয়াম নির্দেশের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের সুপ্রিম লিডার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে না পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন-এমন খবর প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। কারণ বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এই অবস্থান আলোচনার দর-কষাকষিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত সরানো একটি “নিরাপত্তা নিশ্চয়তা”, আর ইরানের কাছে সেটি “প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন”। দুই পক্ষের এই বিপরীত অবস্থান শান্তি আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।

 

রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক দলও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জটিল আলোচনায় চাপের মুখে রয়েছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, সেন্ট্রিফিউজ, মজুতের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ-এসব বিষয়ে আলোচনার ভাষা ও শর্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দলকে কিছু প্রযুক্তিগত বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।

 

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম কঠিন ইস্যু। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ চুক্তির অধীনে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত ও সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ধাপে ধাপে ইরান আবার সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়। বর্তমান যুদ্ধ ও নতুন আলোচনার প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো প্রশ্নই আরও বিস্ফোরক আকারে ফিরে এসেছে।

 

ইরানের অবস্থান হলো, তারা পারমাণবিক অস্ত্র চাইছে না, কিন্তু সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়বে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের হাতে থাকলে ভবিষ্যৎ চুক্তি ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এই কারণেই ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাখা বা ধ্বংস করার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

 

এখন প্রশ্ন হলো, ইরানের এই নির্দেশ কি চূড়ান্ত অবস্থান, নাকি দর-কষাকষির কৌশল? বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান হয়তো আলোচনার শুরুতে সর্বোচ্চ দাবি ধরে রাখতে চাইছে, যাতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় ছাড় আদায় করা যায়। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যদি এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখে, তাহলে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে পারে।

 

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, ট্রাম্প এখনো চূড়ান্তভাবে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, বা ইসরায়েলকে আবার হামলার সবুজ সংকেত দেবেন কি না-তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে কঠোর অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের চাপ বাড়াবে-এমন ইঙ্গিত তাদের বক্তব্যে রয়েছে।

 

সব মিলিয়ে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশেই রাখার নির্দেশ শান্তি আলোচনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেহরান এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে, আর ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এটিকে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক ঝুঁকির মূল উৎস মনে করছে। ফলে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নয়; বরং ইরানের পারমাণবিক মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

 

আগামী কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, তেলের বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ-সবকিছুই এই সংকটের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করবে। ইরান যদি তার অবস্থান নরম না করে, আর যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরেনিয়াম অপসারণের শর্তে অনড় থাকে, তাহলে শান্তি আলোচনার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ