{{ news.section.title }}
ভারতের কিছু জমি নেপালের দখলে আছে: বালেন্দ্র শাহ
ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নতুন মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেছেন, শুধু ভারতই নেপালের ভূমি দখল করেনি; নেপালও বিভিন্ন স্থানে ভারতের কিছু ভূমি দখল করে রেখেছে। রোববার নেপালের সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
শ্রম সংস্কৃতি পার্টির সংসদ সদস্য অ্যারেন রাইয়ের প্রশ্নের জবাবে বালেন্দ্র শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি জানতে পেরেছেন, সীমান্ত দখল বা অনুপ্রবেশের বিষয়টি একতরফা নয়। ভারতের বিরুদ্ধে নেপালের জমি দখলের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি নেপালের বিরুদ্ধেও ভারতের জমি দখলের অভিযোগ আছে। তার মতে, বিষয়টি নিয়ে দুই দেশেরই বসে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেন, সীমান্ত সমস্যা আবেগ বা একতরফা বক্তব্য দিয়ে সমাধান করা যাবে না। ইতিহাস, জরিপ, মানচিত্র ও বাস্তব অবস্থান সবকিছু পর্যালোচনা করে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানে যেতে হবে। তিনি জানান, নেপাল সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে এবং সেই নোটের জবাবও পেয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশ ইতিহাসবিদ, জরিপ বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে যৌথ দল গঠনের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আনতে পারে। শাহ বলেন, সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এমন বিশেষজ্ঞভিত্তিক আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও নেপালের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। নেপাল এসব অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে আসছে। অন্যদিকে ভারতও এসব এলাকাকে নিজের অংশ হিসেবে দেখে। ২০২০ সালে নেপাল নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানিকে অন্তর্ভুক্ত করলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন তৈরি হয়। ভারত তখন বিষয়টিকে একতরফা পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছিল।
সংসদে বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। তিনি আরও জানান, নেপাল সীমান্ত ইস্যুতে শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও কূটনৈতিক আলোচনা করেছে। তার মতে, ব্রিটিশ ভারতের সময় থেকে এই সীমান্ত সমস্যার সূত্রপাত হওয়ায় যুক্তরাজ্যেরও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখানো উচিত।
বালেন্দ্র শাহের এই বক্তব্য নেপালের ভেতরেও বিতর্ক তৈরি করেছে। বিরোধী দলগুলোর কয়েকজন সংসদ সদস্য তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, নেপাল ভারতের জমি দখল করেছে এমন দাবি অত্যন্ত সংবেদনশীল; তাই এর পক্ষে প্রমাণ দেওয়া উচিত, নয়তো সংসদের রেকর্ড থেকে বক্তব্যটি বাদ দেওয়া প্রয়োজন।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই দেশের মানুষের জমি ব্যবহার বা দখলসংক্রান্ত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, কিছু এলাকায় সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, চাষাবাদ, বসতি ও জমি ব্যবহার নিয়ে জটিলতা রয়েছে; এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধের সবচেয়ে আলোচিত এলাকা হলো কালাপানি ও সুস্তা অঞ্চল। কোথাও নদীর গতিপথ পরিবর্তন, কোথাও পুরোনো মানচিত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা, আবার কোথাও সীমান্ত চিহ্নিতকরণের জটিলতা এসব কারণে বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে।
বালেন্দ্র শাহ আরও বলেন, সরকার বিভিন্ন কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন এবং সাম্প্রতিক জেন-জেড বিক্ষোভসংক্রান্ত প্রতিবেদনও রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য ভারত-নেপাল সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতদিন নেপালের রাজনৈতিক আলোচনায় সাধারণত ভারতের বিরুদ্ধে ভূমি দখলের অভিযোগই বেশি উঠে এসেছে। এবার নেপালের পক্ষ থেকেও ভারতের জমি দখলের কথা বলা হওয়ায় সীমান্ত বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, দুই দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক, উন্মুক্ত সীমান্ত, বাণিজ্যিক নির্ভরতা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বিবেচনায় সীমান্ত ইস্যুতে উত্তেজনার বদলে আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। বালেন্দ্র শাহও সেই পথেই সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।