{{ news.section.title }}
ইরানের জন্য সোনা-গয়না, সঞ্চয় ভেঙে সহায়তায় কাশ্মীরিরা
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ব্যতিক্রমী সহায়তা কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে ইরানের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনেক কাশ্মীরি নিজেদের সোনা-গয়না, নগদ অর্থ, গৃহস্থালি সামগ্রী, এমনকি বহুদিনের সঞ্চয়ও দান করছেন। কোথাও শিশুরা তাদের মাটির ব্যাংক ভেঙে দিচ্ছে, কোথাও পরিবারগুলো মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা তামার বাসন তুলে দিচ্ছে, আবার কেউ জীবিকার যানবাহন পর্যন্ত সহায়তার জন্য দান করছেন।
গত ২১ মার্চ, ঈদুল ফিতরের দিন, দক্ষিণ এশাজুড়ে উৎসবের আবহের মধ্যেই বুদগামের বাসিন্দা মাসরাত মুখতার নিজের সোনার কানের দুল সহায়তা তহবিলে জমা দেন। কয়েক মাস আগেই জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া এই দুল তিনি ইরানের যুদ্ধাহত বেসামরিক মানুষের সহায়তায় দিয়ে দেন। তার পরপরই পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজেদের মূল্যবান জিনিস নিয়ে এগিয়ে আসেন। অনেক পরিবার নগদ অর্থের পাশাপাশি তামার বাসন, গবাদিপশু, সাইকেল, এমনকি সঞ্চয়ের অংশও দান করেছে। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাও নিজেদের আয়ের একটি অংশ তুলে দিয়েছেন।
মাসরাত মুখতার বলেন, মানুষ সাধারণত তাদের প্রিয় জিনিসই দান করে, কারণ এতে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। কাশ্মীরকে ঐতিহাসিকভাবে “লিটল ইরান” বা “ছোট ইরান” বলা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সময় ও সংঘাত বদলালেও এই বন্ধন টিকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পর্ক হঠাৎ তৈরি হয়নি; ইরান ও কাশ্মীরের মধ্যে ছয় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগ রয়েছে, যা বর্তমান যুদ্ধে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শ্রীনগরের শিয়া অধ্যুষিত জাদিবাল এলাকায় ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান দেখেছেন, প্রতিবেশীরা তামার হাঁড়ি-পাতিল এনে জমা দিচ্ছেন। তার ভাষ্য, কাশ্মীরি পরিবারগুলো সাধারণত মেয়েদের বিয়ের জন্য এসব বাসনপত্র জমিয়ে রাখে, কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন-যেসব মেয়ে হামলায় মা বা বোন হারিয়েছে, তাদের জন্য এই জিনিসগুলো দেওয়া হবে। ২৪ বছর বয়সী মিনি-ট্রাকচালক সাদাকাত আলী মীর তার জীবিকার দুইটি গাড়ির একটি দান করেছেন। আরও অনেকে সাইকেল, স্কুটার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়েছেন। নয় বছর বয়সী জায়নাব জানের মতো শিশুরাও নিজেদের মাটির ব্যাংক ভেঙে সহায়তায় অংশ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মীরের জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিয়া হওয়ায় ইরানের যুদ্ধ সেখানে আবেগী সাড়া ফেলেছে, তবে সহায়তা কেবল শিয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বহু সুন্নি পরিবারও ঈদের খরচ কমিয়ে সেই অর্থ ইরানের সহায়তায় দিয়েছে। কেউ সাদামাটা খাবারে ঈদ পালন করেছে, কেউ দোকান আগে বন্ধ করেছে, আবার কেউ দৈনন্দিন ব্যয় কমিয়ে তহবিলে অর্থ দিয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারাও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। বুদগামের আইনপ্রণেতা আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহদি নিজের এক মাসের বেতন ত্রাণ তহবিলে দিয়েছেন। পিপলস কনফারেন্সের নেতা ও শিয়া আলেম ইমরান রেজা আনসারিও বলেছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে অংশ নিচ্ছেন।
কাশ্মীরে ইরানের প্রতি এই সহমর্মিতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। চতুর্দশ শতকে ইরানের হামাদান থেকে সুফি আলেম মীর সৈয়দ আলী হামাদানি কাশ্মীরে এসে ধর্মীয় চর্চা, শিল্পরীতি এবং ফার্সি সাহিত্যিক ঐতিহ্য প্রসারে বড় ভূমিকা রাখেন। এখনো কাশ্মীরের বহু ঐতিহাসিক মসজিদে পারস্য স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়, আর স্থানীয় সাহিত্যেও ফার্সি ভাষার ছাপ স্পষ্ট। মধ্য এশীয় অধ্যয়নবিষয়ক গবেষক ইরশাদ আহমদের মতে, প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠান ও শিল্পধারার মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক সংযোগ আজও জীবন্ত। সে কারণেই কাশ্মীরকে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইরান-ই-সাগীর’ বা ‘ছোট ইরান’ বলা হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দানের আর্থিক মূল্য যতটা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর মানসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। মানবিক সহায়তা বিষয়ক শিক্ষক সাকিনা হাসানের ভাষায়, মানুষ শুধু বস্তু দিচ্ছে না, তারা আবেগের এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতাও ভাগ করে নিচ্ছে। বর্তমানে নাজুক যুদ্ধবিরতি চললেও যুদ্ধে ইরানে ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনার প্রথম দফা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা নতুন আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আর বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী বুধবার পর্যন্ত।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কোটি রুপি সমমূল্যের সহায়তা সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, সোনা, গয়না, গৃহস্থালি সামগ্রী, গবাদিপশু এবং যানবাহন। শ্রীনগর, বুদগাম, বারামুলা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত সংগ্রহকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকেরা দানের হিসাব সংরক্ষণ করছেন। বড় অঙ্কের অর্থ ছাড়াও কয়েন, মাটির ব্যাংক, বাসনপত্রের মতো ছোট ছোট সহায়তার পরিমাণও মোট সংখ্যায় অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় শ্রীনগরের এক স্বেচ্ছাসেবক সৈয়দ আসিফি বলেন, সীমিত সামর্থ্যের মানুষও যা পারছে, তাই নিয়ে আসছে। স্থানীয় চিকিৎসকেরা মেডিকেল কিট প্রস্তুত করেছেন, আর শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
নয়াদিল্লিতে ইরানি দূতাবাসও এই সহায়তার বিষয়টি স্বীকার করেছে। এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তারা কাশ্মীরের মানুষের মানবিক সহায়তা ও হৃদয়গ্রাহী সংহতির জন্য ধন্যবাদ জানায়। দূতাবাসের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক বিধবা নারী ২৮ বছর আগে মারা যাওয়া স্বামীর স্মৃতি হিসেবে রাখা সোনা দান করছেন। যদিও পরে সেই পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়, এরপর দূতাবাস আবার ভারত ও কাশ্মীরের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরেকটি বার্তা দেয়। দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ইরানের জন্য যে সহায়তা এসেছে, তার বড় একটি অংশই এসেছে কাশ্মীর থেকে। স্থানীয় সূত্রগুলোর ধারণা, মোট সহায়তার ৪০ শতাংশের বেশি এসেছে উপত্যকা অঞ্চল থেকে।
তবে এই সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও আছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, যাচাই-বাছাই ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করা অর্থের একটি অংশ স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং স্টেট ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সি (SIA) জানিয়েছে, কিছু তহবিল অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেউ যদি সরাসরি ইরানি দূতাবাসে অর্থ জমা দেয়, সে ক্ষেত্রে উদ্বেগ কম; তবে মধ্যস্বত্বভোগী বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তাই স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ম মেনে নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্বেগের কারণ হিসেবে ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করছে। তখন দক্ষিণ কাশ্মীরে মানবিক সহায়তার নামে সংগৃহীত কিছু অর্থ পরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে গেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ইরানের জন্য বর্তমান তহবিল সংগ্রহকারীরা জোর দিয়ে বলছেন, তাদের সব উদ্যোগই সম্পূর্ণ মানবিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা