যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করলে ৩০ হাজার কোটি ডলার পেতে পারে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করলে ৩০ হাজার কোটি ডলার পেতে পারে ইরান
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক উদ্যোগ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনৈতিক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সম্ভাব্য তহবিলের অর্থ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, শিল্পকারখানা, নগর উন্নয়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পে ব্যয় করা হতে পারে।

 

জানা গেছে, প্রস্তাবিত তহবিলটি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হতে পারে। এতে বিভিন্ন দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ পাবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এদিকে টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক অনুমোদনের পর প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওই সময় তহবিলের কাঠামো, অর্থায়নের উৎস, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

 

আলোচনায় থাকা খসড়া চুক্তির অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা কমিয়ে আনা। এ লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ নিয়েও আলোচনা চলছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

 

মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হতে পারে। আলোচনায় লেবাননসহ অঞ্চলের বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যুও স্থান পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

খসড়া সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম, বিদ্যমান মজুতের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় এসব কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। আলোচনার সময়কালীন ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ সীমিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

 

খসড়া প্রস্তাবে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, ইরানকে সীমিত আকারে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ ছাড় করা হলে তা ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আলোচনার দ্বিতীয় ধাপে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ১০ টন নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই মজুতের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক বিকল্প আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় সংরক্ষণ, সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আনা অথবা আংশিকভাবে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনাগুলো সফল হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই সূচনা করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর আগে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে এখনও বেশ কয়েকটি জটিল বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া বাকি রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ