বিশ্ববাজারে ফের কমল তেলের দাম

বিশ্ববাজারে ফের কমল তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আগের দিন বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর মঙ্গলবার (২ জুন) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক এবং যেকোনো নতুন রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনার প্রভাবে বাজারে আবারও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনউইচ সময় মঙ্গলবার সকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ সেন্ট বা ০.৭৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪.২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৮৫ সেন্ট বা ০.৯২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯১.৩১ ডলারে দাঁড়ায়।

 

এর আগে সোমবার দুই ধরনের তেলের দামই ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ফলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও মে মাসজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৬ শতাংশের বেশি কমেছিল।

 

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখনো নিশ্চিত নন যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না। ফলে বাজারে সতর্ক অবস্থান বজায় রয়েছে। ফিলিপ নোভার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সচদেবা বলেন, সম্ভাব্য চুক্তির আশা বাজারে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এখনো এমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা তেলের বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে।

 

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোমবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলেও তার আপত্তি নেই। তবে কিছু সময় পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে এবং উভয় পক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

 

পরে এবিসি নিউজকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

 

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে।

 

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মূল নজর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি, দুই দেশের রাজনৈতিক বার্তা এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থানের ওপর। একই সঙ্গে ওই জলপথ দিয়ে ট্যাংকার চলাচলের বাস্তব পরিস্থিতিও বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মতে, আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোলে তেলের বাজারে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত ঝুঁকিমূল্য বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ কমে যেতে পারে। অন্যদিকে আলোচনা ভেঙে গেলে বা নতুন সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম আবারও দ্রুত বাড়তে পারে।

 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষণ হিসেবে সোমবার লেবানন আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমিত পরিসরের এই সমঝোতা আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা কমে এলে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটও কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।

 

আইজি গ্রুপের বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিনিয়ত নতুন খবর আসছে। ফলে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি বা স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।

 

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত উপসাগরীয় অঞ্চলে অ-ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ সরাসরি ব্যাহত হয়েছে। এই সংকটের কারণেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এশিয়া ও ইউরোপের শোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৫৬ লাখ ব্যারেলের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটি দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানির অন্যতম।

 

এছাড়া রয়টার্স পরিচালিত এক প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, গত ২৯ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল কমেছে। একই সঙ্গে ডিজেল ও পেট্রোলের মজুতও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত মজুত কমে গেলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে, যা ভবিষ্যতে তেলের দামকে ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে।

 

এদিকে সোমবার গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিপিং সম্মেলনে জাহাজ মালিক ও পরিবহন খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো শান্তিচুক্তিতে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েকদিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার গতিপ্রকৃতিই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে। ফলে বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো এখন গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।


সম্পর্কিত নিউজ