{{ news.section.title }}
হরমুজ প্রণালি 'লাল রেখা', শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত আরও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের জন্য ‘অলঙ্ঘনীয় লাল রেখা’ ঘোষণা করে তেহরান সতর্ক করেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নতুন করে হামলা চালান, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সর্বত্র অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানো হলে সেটিরও জবাব দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার একাধিক সামরিক ও সরকারি বিবৃতিতে ইরান জানায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো ধরনের চাপ বা সামরিক হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। এমন অবস্থান এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র টানা পঞ্চম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা।
ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার পর এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অস্তিত্বের যুদ্ধের মুখোমুখি।” তার মতে, এই সংঘাত কেবল সামরিক নয়; এটি ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অবস্থানের প্রশ্নও।
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে দক্ষিণ উপকূলের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে তারা হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা শুধু উপকূল বা দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল নয়; দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই এই কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
একই সময়ে রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সেই সামরিক সক্ষমতাগুলো ধ্বংস করা, যেগুলো ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পরিচালিত বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমান হামলাগুলোকে সম্ভাব্য আরও বিস্তৃত অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইরানের সেনাবাহিনী পুনরায় ঘোষণা করেছে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা হবে। তাদের ভাষায়, “আমরা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাব এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিষ্ক্রিয় করে দেব।” একই সঙ্গে ইরানের সামরিক মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একমাত্র পথ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে জুন মাসে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের শর্ত মেনে নেওয়া এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সম্পর্কিত ইরানের নতুন নিয়ম বাস্তবায়ন করা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, তেহরান যদি আলোচনায় ফিরে না আসে, তাহলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালানো হবে। এই হুমকির জবাবে আকরামিনিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে অবশিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক পাল্টা হামলা চালাবে। তার ভাষায়, ভবিষ্যতের জবাব আগের সব অভিযানের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে।
একই দিনে ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে সেই দেশগুলোকেও এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইরানের সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের প্রতিবেশীদের বুঝতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সুযোগ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে।”
বৃহস্পতিবার ভোরে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে। একই সময়ে কুয়েত সরকার জানায়, তারা সম্ভাব্য শত্রু ড্রোনের হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, আগাম সতর্কীকরণ রাডার এবং আল-শুয়াইবা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জেটি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বৃহস্পতিবার ইরানের লক্ষ্য করে ছোড়া একাধিক আকাশপথের হামলা প্রতিহত করেছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। তবে হামলায় কোনো হতাহত বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত আর শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এখন এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাবে চলে এসেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক অবস্থান আরও কঠোর হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি না হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স