{{ news.section.title }}
আইএমএফের কাছে নতুনভাবে আর্থিক সহায়তা চাইলো বাংলাদেশ
চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে নতুন আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আবেদন করেছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির অনুরোধ করেছে এবং এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ইভো ক্রজনার বলেন, নতুন কর্মসূচি বিবেচনার অংশ হিসেবে আইএমএফের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তার ভাষায়, আইএমএফ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনের প্রচেষ্টায় অংশীদার হিসেবে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নতুন কর্মসূচি কেন চাইছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খাতের দায়, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যার মুখে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সহায়তা কর্মসূচিকে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং সংস্কার কার্যক্রম জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
আইএমএফের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি, এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির আওতায় চলমান কর্মসূচিগুলো কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার পরিকল্পনা পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতির কাঠামো তৈরি প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আইএমএফের আগের কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। নতুন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এসব বিষয়ের সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংক খাত, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
ব্যাংক খাত ও রাজস্ব আহরণ বড় চ্যালেঞ্জ
আইএমএফের বিবৃতিতে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণের নিম্ন হারকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, মূলধন ঘাটতি, সুশাসনের অভাব এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব কারণে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। সরকার উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও অবকাঠামো খাতে বেশি ব্যয় করতে চাইলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে করব্যবস্থা আধুনিক করা, করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে।
নতুন কর্মসূচি হলে রাজস্ব সংস্কার আরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে কর প্রশাসন ডিজিটাল করা, কর অব্যাহতি কমানো, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাস, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনায় থাকতে পারে।
চলমান আইএমএফ কর্মসূচির প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে বড় আকারের ঋণ সহায়তা কর্মসূচি পায়। ওই সময় এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি ও এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটির আওতায় প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির আওতায় প্রায় ১৪০ কোটি ডলার অনুমোদন করা হয়। বাংলাদেশ ছিল এশিয়ার প্রথম দেশ, যারা আইএমএফের জলবায়ু সহনশীলতা–সংক্রান্ত আরএসএফ সুবিধা পায়।
এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করা। পরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় কর্মসূচির আকার বৃদ্ধি এবং সময় বাড়ানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয় আইএমএফ।
আইএমএফের আগের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, কঠিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও বাংলাদেশের কর্মসূচির অগ্রগতি মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছিল, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি কমানো, বৈদেশিক খাতের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতের চাপ কমাতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নতুন কর্মসূচির আকার এখনো নির্ধারিত নয়
আইএমএফ জানিয়েছে, সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির আকার এখনো নির্ধারিত হয়নি। এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সংস্কারের ধরন, নীতিগত প্রতিশ্রুতি এবং আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের ওপর।
নতুন কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার, বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার পরিকল্পনা এবং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক রূপরেখা দরকার হবে। অর্থাৎ শুধু আর্থিক সহায়তার আবেদন করলেই কর্মসূচি অনুমোদন হবে না; বরং সরকার কীভাবে রাজস্ব বাড়াবে, ব্যাংক খাত সংস্কার করবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল করবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে।
আইএমএফের সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি শুধু ঋণ সহায়তা নয়; বরং একটি সংস্কার কাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের পথও সহজ হতে পারে।
ঢাকায় আসতে পারে আইএমএফ মিশন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নতুন কর্মসূচির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার জন্য একটি আইএমএফ স্টাফ মিশন বাংলাদেশ সফর করতে পারে। এই সফরে আইএমএফ কর্মকর্তারা সরকারের নীতিনির্ধারক, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবেন।
মিশনের আলোচনায় সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচক, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, রাজস্ব আদায়, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সংস্কার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হতে পারে। সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির শর্ত, অর্থের পরিমাণ, মেয়াদ এবং বাস্তবায়নযোগ্য অগ্রাধিকার পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
অর্থনীতির জন্য কী অর্থ বহন করছে
নতুন আইএমএফ কর্মসূচির আবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। একদিকে এটি দেখায়, দেশ এখনো বৈদেশিক অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছে। অন্যদিকে এটি সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এ ধরনের কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণত বেশ কিছু কঠিন শর্তও থাকে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা আনতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফ সহায়তা সাময়িকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর। শুধু ঋণ নিলে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না; বরং রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংক খাত, জ্বালানি খাত ও সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর জোর
আইএমএফ বাংলাদেশকে টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আর্থিক স্থিতিশীলতা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়ও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো-একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের নতুন আবেদন শুধু আরেকটি ঋণ কর্মসূচির অনুরোধ নয়; এটি দেশের অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা, সংস্কারের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ সরকার কতটা শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এগোয় এবং আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচির কাঠামো কীভাবে চূড়ান্ত হয়।
তথ্যসূত্র: ইউএনবি