{{ news.section.title }}
সিগারেটের দাম বাড়ছে, কত টাকা পর্যন্ত যাবে?
তামাকপণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার করা এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের সব স্তরের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশে প্রথমবারের মতো নিকোটিন পাউচকে কর কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে প্রচলিত সিগারেটের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের তামাকজাত পণ্যও এখন থেকে কঠোর কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ সংক্রান্ত প্রস্তাব ঘোষণা করবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা কমানো এবং তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখাই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের সিগারেটের মূল্য ৯২ টাকা, উচ্চস্তরের সিগারেটের মূল্য ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ বা প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের দাম ৬০ টাকা, মধ্যম স্তরে ৮০ টাকা, উচ্চস্তরে ১৪০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৮৫ টাকা রয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে চারটি স্তরেই মূল্য বৃদ্ধি পাবে।
নতুন মূল্য কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের দাম ২ টাকা বাড়বে। মধ্যম স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধি হবে ১০ টাকা। উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বাড়বে ২০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম এক ধাপে ২৫ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হবে। ফলে চারটি স্তরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্য বৃদ্ধি ঘটবে প্রিমিয়াম শ্রেণির সিগারেটে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি শলাকা সিগারেটের দাম সর্বনিম্ন ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দাম বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ধূমপায়ীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
সিগারেটের পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো নিকোটিন পাউচকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই পণ্যটি তামাকবিহীন হলেও এতে নিকোটিন থাকে, যা ব্যবহারকারীর মধ্যে আসক্তি তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের পণ্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হবে। এর ওপর ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের পাশাপাশি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ৩৫০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই অর্থ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।
হিটেড টোব্যাকো বা উত্তপ্ত তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও নতুন কর কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতি ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকোর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণ এবং এর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সীমিত পরিসরে বাজার তৈরি করা এসব পণ্যকে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী সিগারেটের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বোচ্চ সম্পূরক শুল্কহার ৬৭ শতাংশ বহাল রাখার প্রস্তাব করবেন বলেও জানা গেছে। একই সঙ্গে অবৈধ তামাকপণ্য উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেটে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণাও আসতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি তামাকপণ্যের গতিবিধি ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে কর ফাঁকি, অবৈধ উৎপাদন এবং নকল পণ্যের বিস্তার কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণত ধূমপানের হার কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন ব্যবহারকারীদের মধ্যে তামাক গ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে উচ্চ কর ও মূল্য বৃদ্ধি একটি পরীক্ষিত নীতি। অন্যদিকে সরকারের জন্য এটি রাজস্ব আয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু মূল্য বৃদ্ধি নয়, একই সঙ্গে তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, বিক্রয় তদারকি এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর কাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নেও কঠোরতা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি সরকারের জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।