{{ news.section.title }}
পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব, নেপথ্যে ৪ জটিল কারণ
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনের প্রকৃত কারণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, পে-স্কেলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে।
গত ১৮ জুন অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নতুন পে-স্কেল সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও কয়েকটি স্পর্শকাতর ও কারিগরি ইস্যুর নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব বিষয় চূড়ান্ত করতে আগামী ২৪ জুন আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা আহ্বান করা হয়েছে।
এদিকে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। এতে লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর আর্থিক স্বার্থ জড়িত থাকায় প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি, প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়ের সমাধান না হওয়ায় গেজেট প্রকাশ আপাতত আটকে রয়েছে।
গেজেট প্রকাশে বিলম্বের চারটি প্রধান কারণ
১. আইনি যাচাই-বাছাই ও বিধিমালা সংশোধন
নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে গেলে বিদ্যমান একাধিক বিধিমালা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা সংশোধনের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ ভেটিং বা আইনি যাচাই বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিটি ধারা, উপধারা ও প্রশাসনিক বিধান খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা বা ব্যাখ্যাগত সমস্যা সৃষ্টি না হয়। তাই এই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতেই কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগছে।
২. অর্থ ছাড় ও ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সরকারের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয় জড়িত। বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। ফলে অর্থ বিভাগকে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট) বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত অর্থায়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হচ্ছে। যাতে এককালীন বড় আর্থিক চাপ তৈরি না হয় এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা না দেয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
৩. ১১ থেকে ২০ গ্রেডের বেতন বৈষম্য নিরসনের জটিলতা
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করা। নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ করে সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ‘শতাংশভিত্তিক বৃদ্ধি’ করা হবে, নাকি নির্দিষ্টভাবে ‘শতভাগ সমন্বয়’ করা হবে-সে বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। এই একটি সিদ্ধান্তের ওপর লাখ লাখ কর্মচারীর ভবিষ্যৎ আর্থিক সুবিধা নির্ভর করছে বলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
৪. iBAS++ ডিজিটাল ফিক্সেশন নাকি বিকল্প পদ্ধতি
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘iBAS++’। নতুন পে-স্কেলের জটিল হিসাব, ইনক্রিমেন্ট, গ্রেডভিত্তিক সমন্বয় এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয় এই সিস্টেমে আপডেট করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিক্সেশন করা হবে কি না, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিকল্প হিসেবে সাময়িক কোনো সহজ পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করা হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে। এ কারণে আইটি বিশেষজ্ঞ এবং হিসাব বিভাগকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবায়নের তারিখে কোনো পরিবর্তন নেই
গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হলেও নতুন পে-স্কেল কার্যকরের নির্ধারিত সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না বলে জানিয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্র। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে।
অর্থাৎ গেজেট যদি জুলাই মাসের শুরুতেও প্রকাশিত হয়, তবুও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া বর্ধিত বেতনের সুবিধা পাবেন। প্রয়োজনে তাদের বকেয়া বা অ্যারিয়ারসহ সব আর্থিক সুবিধা পরবর্তীতে সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, ২৪ জুনের বৈঠকে বাকি থাকা বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হলে নতুন পে-স্কেল সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হাতে পেতে পারেন।