{{ news.section.title }}
জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ছে দেশে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত প্রায় ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখা, শিল্প উৎপাদন ও কৃষিকাজে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি)।
এই চালান সরবরাহ করবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। পুরো আমদানিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি তেল ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতোমধ্যে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের চাহিদা বিবেচনায় সরকার সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি করে। সেই ধারাবাহিকতায় জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের সম্ভাব্য চাহিদা পূরণের জন্য বিপিসি একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে সেটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক ছাড়পত্র দিয়ে প্রস্তাবটি বিপিসির কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন পরবর্তী ধাপে বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেবে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করবে।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে শুরু হওয়া ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকা সচল রাখা, শিল্প উৎপাদন ও কৃষিকাজ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং আকাশপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখাকে এই সিদ্ধান্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত ১০ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করে, যার চিঠি ১৭ জুন বিপিসির হাতে পৌঁছায়। ইতোমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘নোয়া’ ইস্যু করা হয়েছে। এখন চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর খুব দ্রুতই তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে প্রতি ছয় মাস পরপর নিয়মিত তেল আমদানি করা হবে।
আর্থিক ব্যয় ও ডলারের হিসাব
গত ২৪ মে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক প্রস্তাবে বলা হয়, জুন-আগস্ট সময়সীমার মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দরপত্রে পরিমাণ কিছুটা কম-বেশি রাখার সুযোগও রাখা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের গত ১৩ মে তারিখের ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী (১ মার্কিন ডলার = ১২৩.২৫ টাকা) এই আমদানিতে সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। বিপিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই আমদানির অর্থ বিপিসির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজন হলে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
উদ্বেগজনক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাজার পরিস্থিতি
বিপিসির প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং বেশি জাহাজ ভাড়া দাবি করছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি বেশি জটিল। ২০২২ সালে ডিজেলের সর্বোচ্চ দর ছিল প্রতি ব্যারেল ১৭৮.৯১ মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল সেই দর রেকর্ড ২৮৪.৯৫ মার্কিন ডলারে পৌঁছে।
এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দর ছিল ৮৫.৯৯৭ মার্কিন ডলার, যা এপ্রিলে ১১৮.৫০ শতাংশ বেড়ে ১৮৭.৯০৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে এবার প্রিমিয়াম কিছুটা বেড়েছে। তবে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাওয়া দরকে বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিক বলে মনে করছে বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।
দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই
জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। আগামী ৬০ দিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই।
এ বিষয়ে যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইনে কোনো বাধা বা সংকটের আশঙ্কা নেই।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে ধাপে ধাপে একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কার্যকর করা হচ্ছে। তাদের মতে, এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা আনবে এবং ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। শিল্প, কৃষি ও পরিবহনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।