{{ news.section.title }}
জ্বালানি তেল নিয়ে দুর্ভোগ চরমে, দেশে উৎপাদিত অকটেন নিচ্ছে না সরকার
দেশজুড়ে পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা-তেল পেতে ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। অথচ একই সময়ে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ডিপোতে জ্বালানির মজুত ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই দ্বৈত পরিস্থিতি ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন তথ্য সত্য হলে মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হবে। কেন না, তেলের জন্য যেখানে মানুষের ঘুম নেই। রেশনিং করা তেল নিতে কমপক্ষে ৭-৮ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ১০-১২ ঘণ্টাও লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে; সেখানে তেলের মজুত উপচে পড়া এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে তেল না কেনার সিদ্ধান্ত জনমনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে। বিশেষ করে সরকারের জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনার এমন ‘ভুলনীতি’ কারা নিয়েছে সে বিষয়ে সঠিক জবাব না পেলে ক্ষোভ-অসন্তোষ আরও বাড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনায় পরিপক্বতার যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যেখানে চাহিদার একটা বড় অংশ পরিমাণ অকটেন-পেট্রোল দেশে উৎপাদন হয়-সেখানে পাম্পের সামনে মানুষকে কেন ঘণ্টার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তার মানে হচ্ছে, সরকারের সাপ্লাই চেইনে কোনো সমস্যা আছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের আরও অনেক আগে থেকে কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা দরকার ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনা উচিত।
সূত্র জানায়, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পূরণ করে। মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান-এর মধ্যে চারটি বেসরকারি ও একটি সরকারি-এই সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছে। প্রতি মাসে দেশে অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৭৫ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি, যা এককভাবে সবচেয়ে বড় অংশের জোগানদাতা। তবে ৮ এপ্রিল সরবরাহ গ্রহণ না করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।
সংকট বনাম বাড়তি মজুদ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে অকটেন মজুত রাখার সক্ষমতা প্রায় ৫৩ হাজার টন। কিন্তু বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার টন, যা ধারণক্ষমতারও বেশি। এর পাশাপাশি চলতি মাসে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টনের বেশি অকটেন ও পেট্রোল দেশে এসেছে এবং মাস শেষ হওয়ার আগে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি জ্বালানি আমদানি হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহের দিক থেকে ঘাটতি না থাকলেও সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রণব কুমার সাহা, যিনি সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে ১৬ এপ্রিল একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৫ এপ্রিল বিপিসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটিকে এপ্রিল মাসে ৩৭ হাজার টন পেট্রোল-অকটেন এবং ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। সেই অনুযায়ী তারা সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে।
কিন্তু ৮ এপ্রিল থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলো থেকে অকটেন ও পেট্রোল গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়। এতে দেশের অন্যতম বড় স্থানীয় এই জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি চরম সংকটে পড়েছে এবং কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে দাবি করা হয়।চিঠিতে আরও বলা হয়, তাদের তিনটি ট্যাংকার বর্তমানে পূর্ণ হয়ে রয়েছে, অথচ একাধিকবার অনুরোধ করার পরও বিতরণ কোম্পানিগুলো তেল গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
স্থানীয় উৎপাদন থেকেও তেল নিচ্ছে না বিপিসি
এদিকে, দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও অকটেন ও পেট্রোল নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বিপিসি। প্রায় ১০ দিন আগে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দেশে মোট পেট্রোল ও অকটেনের প্রায় ৭৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে স্থানীয় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান-এর মধ্যে চারটি বেসরকারি এবং একটি সরকারি। প্রতি মাসে দেশে প্রায় ৭৫ হাজার টন পেট্রোল ও অকটেনের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করে একটি শীর্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু হঠাৎ করে সরবরাহ গ্রহণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকারে জ্বালানি জমে থাকছে এবং উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের সমস্যা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ফল। যেখানে চাহিদার বড় অংশ দেশেই উৎপাদন হয়, সেখানে পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার ঘাটতি, সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং সময়মতো বিতরণ না হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ হতে পারে।
ডিপোতে জায়গা সংকট
বিপিসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি হওয়ায় ডিপোগুলোতে নতুন করে সংরক্ষণের জায়গা সংকট তৈরি হয়েছে। এমনকি কেরোসিন সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ট্যাংকগুলো অকটেন রাখার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে একদিকে মজুত বাড়ছে, অন্যদিকে পাম্পে সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে পৌঁছাতে পারছে না।
রেশনিং ও আতঙ্কে বাড়ছে লাইন
সম্প্রতি জ্বালানি বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু ও পরে আংশিক শিথিল করা হয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি তেল না দেওয়ার নির্দেশনা বহাল রয়েছে। এতে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে পাম্পের সামনে লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
ডিজেলে কিছুটা স্বস্তি
অন্যদিকে ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। বর্তমানে দেশে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুত রয়েছে। মাসিক চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। চলতি মাসে মোট ৪ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ লাখ টন ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি অংশও শিগগিরই আসার কথা রয়েছে। ফলে ডিজেল সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লোকসান ও আমদানি নিয়ে দ্বিধা
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারকে। এতে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ কারণেও প্রয়োজনের তুলনায় জ্বালানি কেনা ও বিতরণে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিপিসি।
দাম বৃদ্ধি
বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করে গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সরকার অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেনের দাম ১৪০ টাকা।