{{ news.section.title }}
নবীজি (সা.) গোশতের যে অংশ পছন্দ করতেন
মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও আদর্শ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল অত্যন্ত সহজ, পরিমিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। তাঁর প্রতিটি আচরণে ছিল ভারসাম্য, ভদ্রতা, সংযম ও আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক, ইবাদত-বন্দেগি-সবকিছুর মতো খাদ্যাভ্যাসেও তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর ও মধ্যপন্থী।
মহানবী (সা.) কখনো খাবার নিয়ে বিলাসিতা করতেন না, অতিরিক্ত চাহিদাও প্রকাশ করতেন না। হালাল যা পাওয়া যেত, আল্লাহর নেয়ামত মনে করে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতেন। তাঁর জীবনে কখনো দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, কখনো সাধারণ খাবার খাওয়া, আবার কখনো সাহাবিদের দেওয়া উপহারস্বরূপ গোশত গ্রহণের ঘটনা পাওয়া যায়। হাদিস থেকে জানা যায়, হালাল পশুর গোশতের কিছু অংশ তিনি পছন্দ করতেন, তবে সেই পছন্দের মধ্যেও ছিল সংযম, ভদ্রতা ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গোশত পরিবেশন করা হলে তাঁকে পশুর সামনের অংশ বা রান দেওয়া হয়। তিনি এ অংশটি পছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৪০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৪) সহিহ বুখারির বর্ণনায়ও এসেছে, রান্না করা সামনের অংশ বা forearm তাঁর সামনে রাখা হয়েছিল এবং তিনি তা পছন্দ করতেন।
মহানবী (সা.) বিশেষভাবে ছাগলের কাঁধের গোশত পছন্দ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছাগলের গোশতের মধ্যে কাঁধের অংশ অধিক প্রিয় ছিল।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৩২)
আলেমরা বলেন, কাঁধ বা সামনের অংশের গোশত সাধারণত নরম, সুস্বাদু, দ্রুত সিদ্ধ হয় এবং সহজপাচ্য হওয়ায় নবীজি (সা.) এটি পছন্দ করতেন। তবে এটি কোনো বিলাসী পছন্দ ছিল না; বরং স্বাভাবিক খাদ্যরুচির অংশ। আরব নিউজে প্রকাশিত এক ইসলামি আলোচনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, নবীজি (সা.)-এর গোশত খাওয়ার প্রসঙ্গে কাঁধের অংশের কথা কয়েকটি বর্ণনায় এসেছে; আবার হজরত আয়েশা (রা.)-এর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি সব সময় গোশত পেতেন না, কাঁধের অংশ দ্রুত রান্না হতো বলেও তিনি তা গ্রহণ করতেন।
এখানেই নবীজি (সা.)-এর খাদ্যাভ্যাসের বড় শিক্ষা। তিনি কোনো খাবার পছন্দ করলেও কখনো তা নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতেন না। আবার কোনো খাবার অপছন্দ হলে কারও সামনে সেটির দোষ ধরতেন না। এতে খাবার প্রস্তুতকারীর মন ভাঙত না এবং আল্লাহর নেয়ামতের অমর্যাদাও হতো না।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেননি। পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে তা ছেড়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪) সহিহ বুখারির বর্ণনায়ও একই শিক্ষা পাওয়া যায়-তিনি খাবার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে ছেড়ে দিতেন।
ইসলামি শিষ্টাচারে খাবারের ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতা ও ভদ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাবার পছন্দ না হলে সেটিকে অপমান করা, রান্নার দোষ ধরা, খাবার নষ্ট করা বা অন্যের সামনে বিরক্তি প্রকাশ করা সুন্নাহসম্মত আচরণ নয়। নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা হলো-হালাল খাবার আল্লাহর দান; তাই খাবারের প্রতি সম্মান, পরিমিতি ও কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
কোরবানির মৌসুমে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কোরবানির গোশত শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়; আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, দরিদ্র ও অভাবী মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করার মধ্যেই এর সামাজিক সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। নবীজি (সা.)-এর জীবনেও দান ও ভাগাভাগির অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা যায়। হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, একটি পশু জবাই করার পর অধিকাংশ গোশত দান করা হয়েছিল; তখন নবীজি (সা.) দানের অংশকেই প্রকৃত সঞ্চয় হিসেবে বোঝান। সুনান তিরমিজির এই বর্ণনায় কোরবানির মৌসুমে দান ও আখিরাতের পুরস্কারের গভীর শিক্ষা পাওয়া যায়।
হালাল পশুর কিছু অংশ খাওয়া সম্পর্কে ইসলামি ফিকহে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে হানাফি মাজহাবের আলেমরা হালালভাবে জবাই করা পশুর কয়েকটি অংশ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে-প্রবাহিত রক্ত, পুরুষ পশুর প্রজনন অঙ্গ, অণ্ডকোষ, মাদি প্রাণীর প্রজনন অঙ্গ, মাংস গ্রন্থি, মূত্রথলি ও পিত্তথলি। Daruliftaa ও ইসলামিক ফিকহভিত্তিক কয়েকটি সূত্রে হানাফি মত অনুযায়ী এই সাত অংশকে খাওয়ার অযোগ্য বা নাজায়েজ/মাকরুহ তাহরিমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের ফিকহি বিষয়ে সাধারণ মানুষের উচিত স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া। কারণ বিভিন্ন মাজহাবের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তাই কোরবানির পশুর গোশত প্রস্তুত করার সময় শুধু স্বাদের দিক নয়, শরিয়তের বিধান, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মহানবী (সা.)-এর খাদ্যাভ্যাস আমাদের শেখায়-খাবার মানুষের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ। এতে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত; অপচয় নয়, সংযম থাকা উচিত; একার ভোগ নয়, ভাগাভাগি থাকা উচিত। আজকের সমাজে খাবার নিয়ে বিলাসিতা, অপচয়, অযথা বাছবিচার এবং সামাজিক প্রদর্শনীর প্রবণতা বেড়েছে। অথচ প্রিয় নবী (সা.) তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন, খাবারের সৌন্দর্য শুধু স্বাদে নয়; বরং হালাল হওয়া, পরিমিত হওয়া, কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করা এবং অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াতেই প্রকৃত বরকত।
কোরবানির সময় অনেকেই গোশতের ভালো অংশ নিজের জন্য রেখে কম পছন্দের অংশ অন্যকে দিতে চান। কিন্তু সুন্নাহর শিক্ষা হলো-যা নিজে ভালোবাসি, তা থেকেই আল্লাহর পথে দান করার মানসিকতা তৈরি করা। কোরবানির গোশত বণ্টনের সময় দরিদ্র, প্রতিবেশী, আত্মীয় ও অভাবী মানুষকে সম্মান দিয়ে অংশ দেওয়া মুমিনের চরিত্রের পরিচয়।
সব মিলিয়ে নবীজি (সা.)-এর পছন্দের গোশতের অংশ নিয়ে আলোচনা শুধু খাদ্যরুচির বিষয় নয়; এটি তাঁর পরিমিত জীবন, ভদ্র আচরণ, কৃতজ্ঞ হৃদয় এবং মানবিকতার শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি পছন্দ করতেন, কিন্তু বাড়াবাড়ি করতেন না; অপছন্দ হলে ছেড়ে দিতেন, কিন্তু দোষ ধরতেন না; খাবার পেলে কৃতজ্ঞ থাকতেন, আর সুযোগ পেলে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। এই শিক্ষাই কোরবানির মৌসুমে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন-হালাল খাবার গ্রহণ, অপচয় থেকে বিরত থাকা, দরিদ্রের হক আদায় করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম