{{ news.section.title }}
হজে দোয়া কবুলের ৭ বিশেষ স্থান
মুমিনের জীবনে দোয়া এক মহান ইবাদত। এটি শুধু চাওয়ার ভাষা নয়, বরং বান্দার অসহায়ত্ব, বিনয়, ভালোবাসা ও রবের প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার প্রকাশ। মহান আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন এবং তাঁর বান্দার অন্তরের ডাকও শুনে থাকেন। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই কেউ তাঁকে ডাকে, তিনি তার দিকে রহমতের দরজা খুলে দেন। বিশেষ করে যখন কোনো বান্দা একনিষ্ঠ হৃদয়ে, গুনাহের অনুতাপে, আশাভরা অন্তর নিয়ে তাঁর দরবারে হাত তোলে, তখন সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইসলামে এমন কিছু সময়, অবস্থা ও স্থান রয়েছে, যেখানে দোয়া কবুলের আশা আরও প্রবল বলে কোরআন-হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পবিত্র হজের সফর তেমনই এক অনন্য সুযোগ, যেখানে ইবাদত, কান্না, তাওবা, জিকির ও দোয়ার জন্য একাধিক বরকতময় স্থান রয়েছে। এসব স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবী-রসুলদের স্মৃতি, তওবা, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর রহমতের অসংখ্য নিদর্শন। হজে যাত্রাকারীদের জন্য তাই এসব স্থান কেবল আনুষ্ঠানিক আমলের জায়গা নয়; বরং এগুলো হৃদয় উজাড় করে দোয়া করার সুবর্ণ সুযোগ।
কাবা শরিফ প্রথমবার দৃষ্টিগোচর হলে
মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র কাবা শরিফ। এটি আল্লাহর ঘর, ইবাদতের কেন্দ্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত স্থানগুলোর একটি। কাবা শরিফ দেখার মুহূর্ত অনেক হাজির জন্য জীবনের অন্যতম আবেগঘন সময়। এ সময় দোয়া করা সুন্নত এবং এ মুহূর্তকে বহু আলেম দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হাদিসে এসেছে, পবিত্র কাবার দিকে তাকিয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়। হজরত ইবনে জুরাইজ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা শরিফকে দেখে এই দোয়া পড়েছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি এই ঘরের সম্মান, মর্যাদা ও মহিমা বৃদ্ধি করে দিন এবং যে ব্যক্তি এই ঘরের হজ ও ওমরা করে তারও সম্মান মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিন।’ (মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার: ৯৭৯৬)
কাবার প্রথম দর্শন একজন মুমিনের অন্তরকে নরম করে দেয়। এ মুহূর্তে বান্দা যখন দুনিয়ার ব্যস্ততা ভুলে শুধু রবের দিকে ফিরে যায়, তখন তার দোয়া আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে।
মুলতাজাম ও মিজাবে রহমত
দোয়া কবুলের আলোচনায় মুলতাজামের নাম বিশেষভাবে আসে। হাজরে আসওয়াদ থেকে কাবা শরিফের দরজা পর্যন্ত যে অংশ, সেটিই মুলতাজাম। বহু আলেমের মতে, এটি আল্লাহর দরবারে মিনতি পেশ করার এক বিশেষ স্থান। এখানে এসে মানুষ বুক, হাত ও কপাল লাগিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করে।
কাবার ছাদের পানি পড়ার উত্তর পাশের সোনালি পরনালাকে বলা হয় মিজাবে রহমত। হাতিমের ভেতরে এই অংশও রহমত, বরকত ও দোয়ার জায়গা হিসেবে প্রসিদ্ধ।
হজরত আমর ইবনে শুয়াইব (রা.) বর্ণনা করেন,
আমি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর সঙ্গে হজে ছিলাম। তিনি হাজরে আসওয়াদ ও কাবা শরিফের দরজার মাঝের দেওয়ালের নিকট দাঁড়ালেন। নিজের বুক, দুই হাত ও কপাল লাগিয়ে রাখলেন এবং বললেন, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি এভাবেই করতে দেখেছি। (ইবনে মাজা: ২৯৬২)
মুলতাজামে দাঁড়িয়ে করা দোয়া মানুষের হৃদয়ের গভীরতম কথাগুলোকে রবের দরবারে পৌঁছে দেয়-এমন বিশ্বাস বহু যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে চলে আসছে।
সাফা-মারওয়া ও সায়ির পথ
সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। হজ ও ওমরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো এই দুই পাহাড়ের মাঝখানে সায়ি করা। এই সায়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত হাজেরা (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগ, আকুতি ও মাতৃত্বের স্মৃতি, যখন তিনি তাঁর শিশু সন্তান ইসমাইল (আ.)-এর জন্য পানির সন্ধানে দৌড়েছিলেন।
এই দুই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে দোয়া করা সুন্নত। সায়ির মাঝের কিছু অংশে দ্রুত চলা বা দৌড়ানোর যে আমল, তা-ও সেই ইতিহাসের অংশ। এ পথ শুধু শারীরিক চলাচলের নয়; এটি আল্লাহর ওপর ভরসা ও প্রার্থনারও প্রতীক।
সাফা ও মারওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে নবীজি দোয়া করেছেন; আরাফায় উটের ওপর বসে হাত সিনা পর্যন্ত উঠিয়ে মিসকিন যেভাবে খাবার চায় সেভাবে দীর্ঘ দোয়া ও কান্নাকাটি করেছেন; আরাফার যে জায়গায় তিনি অবস্থান করেছেন সেখানে স্থির হয়ে সূর্য হেলে গেলে নামাজ আদায় করার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া করেছেন। মুজদালিফার মাশআরুল হারামে ফজরের নামাজের পর আকাশ ফরসা হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ আকুতি-মিনতি ও মুনাজাতে রত থেকেছেন। (মুসলিম: ১২১৮)
এ থেকেই বোঝা যায়, হজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে দোয়ার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
আরাফাত: হজের হৃদয়স্থল
আরাফার ময়দান হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি। বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, ‘হজ হলো আরাফা’-অর্থাৎ আরাফার অবস্থান হজের মূল কেন্দ্র। বহু বর্ণনায় এসেছে, হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন এই ময়দানেই হয়েছিল। এখানেই তাঁদের তওবা কবুল হয় বলেও ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
আরাফার দিন মূলত দোয়া, কান্না, তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার দিন। এ দিনে বান্দা যত বেশি আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, তত বেশি রহমতের আশা করতে পারবে।
হজরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে হজরত হাওয়া (আ.) এই দোয়াটি পড়েছিলেন,
رَبَّنَا ظَلَمۡنَاۤ اَنۡفُسَنَا ٜ وَ اِنۡ لَّمۡ تَغۡفِرۡ لَنَا وَ تَرۡحَمۡنَا لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ
হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩)
হাদিসে এসেছে, উত্তম দোয়া হলো আরাফার দিবসের দোয়া এবং উত্তম কথা হলো যা আমি এবং আমার আগের নবীরা বলেছেন। ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তারই, প্রশংসাও তার, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। ’ (তিরমিজি: ৩৫৮৫)
এই দিনটি মুসলমানের জীবনের অন্যতম বড় ক্ষমা প্রার্থনার দিন। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে আরাফায় দোয়া করে, তার জন্য ক্ষমা, রহমত ও মুক্তির আশা অনেক বেশি।
মুজদালিফা ও মাশআরুল হারাম
আরাফা থেকে মুজদালিফায় ফেরার পর হাজিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান শুরু হয়। এখানে রাতযাপন, জিকির, দোয়া এবং ভোরের পর মাশআরুল হারামে অবস্থান-সবকিছুই বরকতময় আমলের অংশ। মুজদালিফায় দোয়া করা বহু আলেমের মতে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতি আমল।
মহান আল্লাহ বলেন,
فَاِذَاۤ اَفَضۡتُمۡ مِّنۡ عَرَفٰتٍ فَاذۡکُرُوا اللّٰهَ عِنۡدَ الۡمَشۡعَرِ الۡحَرَامِ
‘তোমরা যখন আরাফা থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, মাশআরুল হারামের কাছে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৮)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুজদালিফায় অবস্থানকালে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ডাকো। তোমাদের দোয়া কবুলের কিছু স্থানে আছ। তবে জেনে রেখ! মহান আল্লাহ গাফেল অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।’ (তিরমিজি: ৩৪৭৯)
এই হাদিস আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়-দোয়ার স্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্তরের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। গাফেল, উদাসীন ও অন্যমনস্ক হৃদয়ের বদলে মনোযোগী, বিনীত ও কান্নাভেজা অন্তরই দোয়ার প্রাণ।
কঙ্কর নিক্ষেপের পর দোয়া
মিনায় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ হজের একটি পরিচিত আমল। অনেকেই এটিকে শুধু আনুষ্ঠানিক কাজ মনে করলেও এর সঙ্গেও নববী আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জড়িয়ে আছে-আর তা হলো কঙ্কর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ দোয়া করা।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবির বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কেবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দোয়া করতেন।
অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কেবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দোয়া করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ করতে দেখেছি। (বুখারি: ১৭৫১)
এ থেকে বোঝা যায়, কঙ্কর নিক্ষেপের পর দোয়া হজের আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিদায়ী তাওয়াফের পর শেষ মিনতি
হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দেশে ফেরার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা হয়। এই সময় হাজির হৃদয়ে একদিকে থাকে হজ সম্পন্ন হওয়ার তৃপ্তি, অন্যদিকে থাকে বিদায়ের বেদনা। তাই বিদায়ী তাওয়াফের পর মুলতাজামে গিয়ে শেষবারের মতো চোখের জল ফেলে দোয়া করা বহু মানুষের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তাওয়াফ শেষে আপনি মুলতাজামের কাছে চলে যাবেন। মুলতাজামে চেহারা, বুক, দুই বাহু ও দুই হাত রেখে দোয়া করবেন। এটিই আপনার শেষ সুযোগ। একে কাজে লাগান। আল্লাহর কাছে যা খুশি আপনি চাইতে পারেন।
হাদিসে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হাজরে আসওয়াদ ও কাবা শরিফের দরজার মাঝের দেওয়ালের নিকট দাঁড়ালেন। নিজের বুক, দুই হাত ও কপাল লাগিয়ে রাখলেন এবং বললেন- নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি এভাবেই করতে দেখেছি।’ (ইবনে মাজা: ২৯৬২)
এই মুহূর্ত একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত আবেগঘন। তাই বিদায়ের আগে এই সুযোগকে অনেকেই জীবনের বড় আধ্যাত্মিক সম্পদ হিসেবে মনে করেন।
দোয়া কবুলের জন্য কীভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত
শুধু স্থান বিশেষ হলেই দোয়া কবুল হবে-এমনটি নয়। দোয়া কবুলের জন্য অন্তরের একাগ্রতা, হালাল উপার্জন, গুনাহ থেকে তওবা, আল্লাহর প্রশংসা, দরুদ শরিফ পাঠ, বিনয়, কান্না ও দৃঢ় আশা-এসবও জরুরি। হজের সফরে দোয়ার স্থানগুলো বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে হাজির অন্তরও হতে হবে বিনম্র ও আল্লাহমুখী।
হজে যারা যান, তাদের উচিত শুধু নিজের জন্য নয়; পরিবার, আত্মীয়স্বজন, মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের জন্যও দোয়া করা। কারণ দোয়া একটি সামষ্টিক রহমতও বটে।
পবিত্র হজ কেবল নির্দিষ্ট কিছু আমলের সমষ্টি নয়; এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক সফর। কাবা শরিফ, মুলতাজাম, মিজাবে রহমত, সাফা-মারওয়া, আরাফাত, মুজদালিফা, জামরার পরের ময়দান এবং বিদায়ী তাওয়াফের মুহূর্ত-এসব স্থান ও সময় একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার বিশেষ সুযোগ। তাই হজের সফরে দোয়া যেন কেবল আনুষ্ঠানিক শব্দ না হয়; বরং তা হয়ে ওঠে হৃদয়ের গভীর আবেদন, তওবার কান্না এবং আল্লাহর রহমত পাওয়ার একান্ত মিনতি।