আরাফাতের ময়দান একটি নাম, একটি ইতিহাস

আরাফাতের ময়দান একটি নাম, একটি ইতিহাস
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ পবিত্র আরাফাতের দিন। হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। এ কারণে আরাফাতের দিনকে হজের প্রাণ বলা হয়। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের হজ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ৯ জিলহজ হাজিরা আরাফাতে গিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও জিকিরে সময় কাটান। এরপর তারা মুজদালিফার দিকে রওনা হন।

আরাফাতের ময়দান পবিত্র মক্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত। সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জাবালে রহমত বা আরাফাতের পাহাড় মক্কা নগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার পূর্বে আরাফাত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর একটি। এটি আরাফাত ময়দানের পূর্ব পাশে অবস্থিত।

 

আরবি ‘আরাফা’ শব্দের অর্থ জানা, চেনা, উপলব্ধি করা বা স্বীকার করা। আরাফাত নামকরণের বিষয়ে ইসলামি ইতিহাসে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, জিবরাঈল (আ.) ইবরাহিম (আ.)-কে হজের বিধান শেখানোর পর জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?’ ইবরাহিম (আ.) উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ।’ এ থেকে আরাফাত নামের উৎপত্তির কথা বলা হয়। আবার বলা হয়, হাজিরা এ ময়দানে এসে নিজেদের গুনাহ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তাই এর নাম আরাফাত।

 

আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আরাফাতের ময়দানে সাক্ষাৎ হওয়ার কথাও ইতিহাসের কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়। তবে ইসলামি গবেষকরা সতর্ক করেছেন, আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নেমে আসার বিষয়টি কোরআনে প্রমাণিত হলেও তাঁরা পৃথিবীর ঠিক কোন স্থানে নেমেছিলেন বা কোথায় সাক্ষাৎ করেছিলেন-এ বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে নিশ্চিত বর্ণনা নেই। তাই এ ধরনের বর্ণনা আকিদার নিশ্চিত বিষয় হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা উচিত।

 

আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের গুরুত্ব এত বেশি যে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফা।’ জামে তিরমিজির বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি ফজরের আগে আরাফায় উপস্থিত হতে পারে, তার হজ আদায় হয়ে যায়।

 

আল কাওসারের হজবিষয়ক মাসআলা অনুযায়ী, ৯ জিলহজ সূর্য ঢলার পর থেকে পরবর্তী রাতের সুবহে সাদিকের আগে অল্প সময়ের জন্য হলেও আরাফার ময়দানে অবস্থান করলে হজের এই ফরজ আদায় হয়ে যায়। তবে কেউ সূর্যাস্তের আগে আরাফায় পৌঁছালে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করা ওয়াজিব।

 

আরাফাতের দিন হাজিদের জন্য সবচেয়ে বড় আমল হলো আল্লাহর সামনে বিনয়, কান্না, তওবা ও দোয়ায় নিজেকে সমর্পণ করা। এ দিন মসজিদে নামিরায় আরাফার খুতবা দেওয়া হয়। সৌদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত আলেম আরাফার খুতবা দেন এবং এরপর জোহর ও আসর নামাজ একসঙ্গে ও সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করান।

 

আরাফাতের দিনের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আরাফার দিনের চেয়ে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ বেশি সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন।

 

এ দিন দোয়ারও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ একই হাদিসে তিনি আরও বলেছেন, তিনি ও পূর্ববর্তী নবীরা যে শ্রেষ্ঠ কথা বলেছেন, তা হলো-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।

 

আরাফাতের দিন ইসলামের ইতিহাসেও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, সুরা মায়িদার সেই আয়াত-“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম”-আরাফার দিন নাজিল হয়েছিল। উমর (রা.) বলেছেন, এই আয়াত আরাফার দিন, শুক্রবার নাজিল হয়েছিল।

 

তবে আরাফাতের ময়দানের ফজিলত মানে জাবালে রহমত পাহাড়ে ওঠা আবশ্যক-এমন নয়। অনেক হাজি আবেগের কারণে জাবালে রহমতে উঠতে চান। কিন্তু আলেমদের মতে, আরাফাতের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে যেকোনো স্থানে অবস্থান করলেই উকুফে আরাফা আদায় হয়ে যায়। জাবালে রহমতে ওঠার আলাদা কোনো নির্দিষ্ট ফজিলত প্রমাণিত নয়। ইসলাম কিউএ-র আলোচনায়ও বলা হয়েছে, জাবালে রহমতে ওঠা বা সেখানে বিশেষভাবে নামাজ-দোয়ার জন্য নিজেকে বাধ্য করা সুন্নাহ হিসেবে প্রমাণিত নয়।

 

আরাফাতের ময়দান মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক অনন্য দৃশ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ একই পোশাকে, একই রবের সামনে, একই আকুতি নিয়ে দাঁড়ান। এখানে ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত, আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য থাকে না। সবাই আল্লাহর বান্দা হিসেবে ক্ষমা, রহমত ও নাজাতের আশায় উপস্থিত হন।

 

এই অবস্থান মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ঈদ এবং হজ-সব ক্ষেত্রেই ইসলামে জামাত, ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা রয়েছে। আরাফাতের ময়দান সেই ঐক্যের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রকাশ।

 

চলতি হজ মৌসুমেও হাজিরা মিনায় অবস্থান শেষে আরাফাতের ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সৌদি গেজেট জানিয়েছে, হাজিরা তারবিয়ার দিন মিনায় অবস্থান শেষ করে ৯ জিলহজ ভোরে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের জন্য প্রস্তুতি নেন, যা বার্ষিক হজের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

 

আরাফাত শুধু হাজিদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; যারা হজে নেই, তাদের জন্যও এ দিন ইবাদত, রোজা, দোয়া ও তওবার বিশেষ সুযোগ। তবে আরাফার রোজা হাজিদের জন্য নয়; বরং যারা হজে নেই, তাদের জন্য সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ আমল। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে আশা করেছেন, এটি আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।


সম্পর্কিত নিউজ