বিশ্বকাপে ভেঙে যেতে পারে যে ৫টি রেকর্ড

বিশ্বকাপে ভেঙে যেতে পারে যে ৫টি রেকর্ড
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

আর মাত্র ছয় দিন পরই পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসরের। এবারই প্রথম ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ। দলসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে ম্যাচের সংখ্যাও। আগের ৬৪ ম্যাচের পরিবর্তে এবার মাঠে গড়াবে ১০৪টি ম্যাচ। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘রাউন্ড অব ৩২’ বা ৩২ দলের নকআউট পর্ব।

বিশ্বকাপের এই নতুন কাঠামো শুধু প্রতিযোগিতার পরিধিই বাড়াচ্ছে না, বরং খেলোয়াড় ও কোচদের সামনে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ার সুযোগও তৈরি করছে। ফুটবল ইতিহাসের বেশ কয়েকটি দীর্ঘদিনের রেকর্ড এবার ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পাঁচটি রেকর্ড নিয়েই এখন আলোচনা চলছে ফুটবল অঙ্গনে।

 

১। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ী কোচ

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডটি এখনো জার্মান কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শনের দখলে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে টানা চারটি বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির দায়িত্ব পালন করে ২৫ ম্যাচে ১৬টি জয় পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর অধীনে দল একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, একবার রানার্সআপ এবং একবার তৃতীয় স্থান অর্জন করে।

 

তবে এবার সেই রেকর্ড বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ফ্রান্সের প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশম বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৯ ম্যাচে ১৪টি জয় পেয়েছেন। এবারের আসরে ফ্রান্সের গ্রুপে রয়েছে নরওয়ে, সেনেগাল ও ইরাক। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে গ্রুপ পর্বেই অন্তত দুটি জয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ফরাসিদের। সেক্ষেত্রে হেলমুট শনের রেকর্ড স্পর্শ করবেন দেশম। আর নকআউট পর্বে একটি জয় পেলেই তিনি হয়ে যাবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচজয়ী কোচ।

 

২। এক আসরে সর্বাধিক গোলের নতুন ইতিহাস?

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে মোট ১৭২টি গোল হয়েছিল, যা বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ম্যাচপ্রতি গড় গোল ছিল ২.৬৯। কিন্তু এবার ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে ১০৪ হওয়ায় নতুন গোলরেকর্ড প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। এমনকি ১৯৯০ সালের মতো রক্ষণাত্মক বিশ্বকাপ হলেও, যেখানে ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ছিল মাত্র ২.২১, তবুও ১০৪ ম্যাচে মোট গোলের সংখ্যা ২৩০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

 

৩। চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলারদের নতুন রেকর্ড

বিশ্বকাপের ২২টি আসরের ইতিহাসে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ফুটবলার মাঠে নেমেছেন মাত্র সাতজন। কিন্তু এবার এক আসরেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (৪১), জার্মানির মানুয়েল নয়ার (৪০), বসনিয়ার এদিন জেকো (৪০), স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডন (৪৩), ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ (৪০), উরুগুয়ের ফার্নান্দো মুসলেরা (৪০) এবং মেক্সিকোর গুইয়ের্মো ওচোয়া (৪০)। এই তালিকার মাত্র দুজন খেলোয়াড়ও যদি মাঠে নামেন, তাহলেই এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলার খেলার নতুন রেকর্ড গড়ে যাবে।

 

৪। ক্লোসার গোলরেকর্ড কি এবার ভাঙবে?

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে এখনও শীর্ষে আছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি করেছেন ১৬ গোল। তবে এবার তাঁর রেকর্ডটি বড় পরীক্ষার মুখে। সবচেয়ে বড় দুই দাবিদার লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে। মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৩, আর এমবাপ্পের ১২। এ ছাড়া ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, হ্যারি কেইন ও নেইমারের নামও আলোচনায় থাকলেও তাঁদের সঙ্গে ক্লোসার ব্যবধান তুলনামূলক বেশি।

 

বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর। অন্যদিকে এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৮। ফলে মেসি যদি এবার রেকর্ডটি ভেঙেও ফেলেন, ভবিষ্যতে সেটি নিজের করে নেওয়ার সুযোগ থাকবে এমবাপ্পের সামনে। তবে বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ফরাসি তারকা এবারই রেকর্ডটি ভেঙে দিতে পারেন। গত বিশ্বকাপে তিনি একাই করেছিলেন ৮ গোল, আর মেসি করেছিলেন ৭ গোল। তাঁদের মধ্যে কেউ আগের আসরের পারফরম্যান্সের অর্ধেকও পুনরাবৃত্তি করতে পারলে ক্লোসার রেকর্ড আর টিকে থাকবে না।

 

৫। ইয়ামালের সামনে দুই ঐতিহাসিক রেকর্ড

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গোল্ডেন বুট জয়ের রেকর্ডটি এখনও জার্মানির টমাস মুলারের দখলে। ২০১০ বিশ্বকাপে মাত্র ২০ বছর বয়সে ৫ গোল করে এই কীর্তি গড়েছিলেন তিনি। তবে এবার সেই রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা রয়েছে স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের সামনে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন তিনি। ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই উইঙ্গার।

 

শুধু গোল্ডেন বুট নয়, সর্বকনিষ্ঠ সেরা খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ডও হুমকির মুখে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ২১ বছর বয়সে টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও। ইয়ামাল কিংবা তাঁর মতো কোনো তরুণ তারকা অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখাতে পারলে সেই রেকর্ডও নতুন মালিক পেতে পারে।

 

৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ এবং নতুন নকআউট কাঠামো নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুধু সবচেয়ে বড় আয়োজনই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের বহু পুরোনো রেকর্ড বদলে যাওয়ারও সবচেয়ে বড় মঞ্চ হতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক সপ্তাহে রেকর্ড বইয়ের কতগুলো পাতা নতুন করে লিখতে হয় ফুটবল বিশ্বকে।


সম্পর্কিত নিউজ