কেপ ভার্দের চাপে শেষ ষোলোয় উঠল আর্জেন্টিনা

কেপ ভার্দের চাপে শেষ ষোলোয় উঠল আর্জেন্টিনা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনার জন্য এটি ছিল কেবল শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করার ম্যাচ নয়, বরং শিরোপা ধরে রাখার অভিযানের প্রথম নকআউট পরীক্ষা। আর কেপ ভার্দের জন্য এটি ছিল দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাত। শেষ পর্যন্ত ফলাফল ৩–২, বিজয়ী আর্জেন্টিনা।

কিন্তু মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম ছেড়ে বের হওয়ার সময় বিশ্বের অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমী যে দলটির জন্য হাততালি দিয়েছে, সেটি ছিল বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ১২০ মিনিট পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েও তারা জয় করেছে কোটি মানুষের হৃদয়।

 

ম্যাচের আগে অনেক বিশ্লেষকই এটিকে একপেশে লড়াই হিসেবে দেখেছিলেন। ফিফা র‍্যাঙ্কিং, অভিজ্ঞতা, তারকাবহুল স্কোয়াড-সব দিক থেকেই আর্জেন্টিনা ছিল পরিষ্কার ফেবারিট। অন্যদিকে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছে। কিন্তু মাঠে নেমে সেই ব্যবধানের ছিটেফোঁটাও বোঝা যায়নি।

 

লিওনেল স্কালোনির জন্যও ম্যাচটি ছিল বিশেষ। এটি ছিল আর্জেন্টিনা কোচ হিসেবে তাঁর ১০০তম ম্যাচ। অন্যদিকে লিওনেল মেসি নিজের বিশ্বকাপ ইতিহাসে আরেকটি নতুন রেকর্ড গড়তে মাঠে নামেন। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড আরও বাড়িয়ে নেন।

 

শুরু থেকেই বলের দখল নেয় আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো দে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখলেও কেপ ভার্দের রক্ষণ ছিল অসাধারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। গোলরক্ষক ভোজিনিয়া শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। লাউতারো মার্তিনেজ ও থিয়াগো আলমাদার কয়েকটি প্রচেষ্টা সহজেই সামলে দেন তিনি।

 

অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে আর্জেন্টিনার কাঙ্ক্ষিত গোল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের লম্বা পাস বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে দ্বিতীয় স্পর্শেই বল জালের ঠিকানায় পাঠান লিওনেল মেসি। গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ওপর দিয়ে চিপ করা সেই ফিনিশিং আবারও দেখিয়ে দেয় কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে মেসির সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম গোল। একই সঙ্গে টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি।

 

গোল হজমের পরও কেপ ভার্দে ভেঙে পড়েনি। প্রথমার্ধের শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজ নিশ্চিত গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ৪০ বছর বয়সী ভোজিনিয়া দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে রাখেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ম্যাচজুড়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। মেসির একাধিক শট, ফ্রি-কিক এবং কাছ থেকে নেওয়া প্রচেষ্টাও ঠেকিয়ে দেন তিনি।

 

দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। কেপ ভার্দে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের জোরালো শট এমিলিয়ানো মার্তিনেজ কোনোমতে ঠেকিয়ে দেন। তবে পাঁচ মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি। অধিনায়ক রায়ান মেন্দেসের নিখুঁত কাটব্যাক থেকে দারুণ কোণাকুণি শটে সমতা ফেরান দেরয় দুয়ার্তে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এই গোলের পর পুরো স্টেডিয়ামে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

 

গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা একের পর এক পরিবর্তন আনে। মাঠে নামেন হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেস ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস। মেসি নিজেও আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেন। ৬২ মিনিটে তাঁর নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দেন ভোজিনিয়া। ৭২ মিনিটে নেওয়া ফ্রি-কিক কর্নারের বিনিময়ে ঠেকিয়ে দেন অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। ম্যাচের শেষদিকে পারেদেসের দূরপাল্লার শটও প্রতিহত করেন তিনি।

 

নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১–১ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

 

৯২ মিনিটে আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নার থেকে ম্যাক অ্যালিস্টারের ফ্লিক পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। মনে হচ্ছিল, এবার হয়তো প্রতিরোধ ভেঙে গেল।

 

কিন্তু কেপ ভার্দে আবারও ফিরে আসে।

 

১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন সিডনি লোপেস কাবরাল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অনেকেই গোলটিকে টুর্নামেন্টের সেরা গোলগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

ম্যাচ তখন টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখেও উদ্বেগ স্পষ্ট।

 

শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে ভাগ্য সহায় হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের হাতে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়। গোলটি আত্মঘাতী হিসেবে গণ্য হয় এবং সেটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

 

তবুও হাল ছাড়েনি কেপ ভার্দে। ১১৬ মিনিটে সিডনি কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে কর্নারে পাঠান। ১১৯ মিনিটে গিলসন বেঞ্চিমোলের নিশ্চিত গোলও অসাধারণভাবে রুখে দেন আর্জেন্টিনার এই গোলরক্ষক। ম্যাচের শেষ আক্রমণ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাঁপিয়ে গেছে আফ্রিকার দলটি।

 

ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের উল্লাসে যেমন স্বস্তির ছাপ ছিল, তেমনি কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের চোখে ছিল অপূর্ণ স্বপ্নের আক্ষেপ। তবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে তাদের সাহসী ফুটবল। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে অপরাজিত থেকে নকআউটে ওঠা দলটি এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদেরও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াইয়ে বাধ্য করেছে।

 

বিশ্বকাপ শেষ হলেও কেপ ভার্দের এই যাত্রা দীর্ঘদিন মনে রাখা হবে। ক্ষুদ্র এক দ্বীপরাষ্ট্র দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে ইতিহাস, বাজেট কিংবা জনসংখ্যা সব সময় ফল নির্ধারণ করে না। আর আর্জেন্টিনা? তারা জিতেছে ঠিকই, কিন্তু শিরোপা ধরে রাখার পথে যে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, কেপ ভার্দে তাদের সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল।

 

এখন শেষ ষোলোর দিকে তাকিয়ে আর্জেন্টিনা। আগামী ৭ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে মিসর। তবে কেপ ভার্দের বিপক্ষে এই কঠিন পরীক্ষার পর স্কালোনির দল বুঝে গেছে-বিশ্বকাপে কোনো প্রতিপক্ষকেই আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।


সম্পর্কিত নিউজ