{{ news.section.title }}
শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি, ঠিক ছিল রেফারির সিদ্ধান্ত?
ওটা কি সত্যিই পেনাল্টি ছিল? বেলজিয়াম–সেনেগাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন এখন এটিই। সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে ১২৫ মিনিট পর্যন্ত গড়ানো নাটকীয় ম্যাচে ইউরি টিলেমান্সের পেনাল্টি গোলে ৩–২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। কিন্তু ম্যাচের ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত সময়ের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
সেনেগাল যখন ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, তখন ম্যাচে বেলজিয়ামের ফেরার সম্ভাবনা খুব কমই দেখছিলেন অনেকেই। ৮৬ মিনিটে রোমেলু লুকাকুর গোল এবং তিন মিনিট পর ইউরি টিলেমান্সের সমতাসূচক গোলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। এরপরও দুই দলকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। টাইব্রেকার প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই আসে সেই মুহূর্ত।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে বেলজিয়ামের আক্রমণ থেকে নিচু ক্রস আসে বক্সের ভেতরে। বল পরিষ্কার করতে স্লাইড করেন সেনেগালের মিডফিল্ডার লামিন কামারা। টিলেমান্সও একই বলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। প্রথমে রেফারি সাইদ মার্তিনেজ খেলা চালিয়ে দেন। খেলোয়াড়রাও ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচ টাইব্রেকারের দিকেই যাচ্ছে।
কিন্তু ভিএআর রুম থেকে রেফারিকে ঘটনাটি পুনরায় দেখতে বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে রিপ্লে পর্যালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে দেখা যায়, টিলেমান্স ইতিমধ্যেই পেনাল্টি স্পটের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, যেন তিনি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বেশ আত্মবিশ্বাসী। প্রায় সাত মিনিটের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর মনিটর দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন হন্ডুরাসের রেফারি সাইদ মার্তিনেজ।
রিপ্লেতে দেখা যায়, কামারার ডান পা টিলেমান্সের বাঁ পায়ের গোড়ালির কাছে স্পর্শ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই স্পর্শ ফাউল দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল কি না। এখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টিলেমান্স বলে স্পর্শ করার আগেই কামারার ট্যাকল তাঁর পায়ে আঘাত করে। সেই কারণেই ভিএআর রেফারিকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়। রেফারি শেষ পর্যন্ত ভিএআরের মতের সঙ্গে একমত হয়ে পেনাল্টি দেন।
তবে সবাই যে সিদ্ধান্তটির সঙ্গে একমত, তা নয়।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্লেষক গ্যারি নেভিল সরাসরি বলেছেন, তাঁর কাছে এটি পেনাল্টি মনে হয়নি। তাঁর ভাষায়, “এই টুর্নামেন্টে যে মানদণ্ডে পেনাল্টি দেওয়া হয়েছে, সেটির সঙ্গে এটি যায় না। টিলেমান্স যদি আগে বলে স্পর্শ করতেন, তাহলে বিষয়টি আলাদা হতো।”
রয় কিনও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, “এটি অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত। রেফারি এত দীর্ঘ সময় মনিটর দেখেছেন যে তাঁর নিজের মধ্যেও দ্বিধা ছিল বলে মনে হয়েছে।”
সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও ম্যাচ শেষে হতাশা লুকাতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমাদের বিশ্বাস, এটি কোনোভাবেই পেনাল্টি ছিল না। খেলোয়াড়েরা প্রতিবাদ করেছে, সেটি তাদের অধিকার। এরপর পেনাল্টি হলো, আর আমরা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলাম।”
সেনেগালের ক্ষোভের পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। চলতি বছরের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালেও শেষ মুহূর্তের এক পেনাল্টি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো দলটির মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে সিয়াটলের এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
ম্যাচের সময় আরেকটি ঘটনাও বিতর্কের জন্ম দেয়। পেনাল্টি সিদ্ধান্তের পর সেনেগালের পাথে সিস পেনাল্টি স্পটের কাছে শুয়ে পড়ে খেলা বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন। বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা তখন শট নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ফাউলের সিদ্ধান্ত থেকে পেনাল্টি নেওয়া পর্যন্ত প্রায় সাত মিনিট সময় পার হয়ে যায়।
টিলেমান্স শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি থেকে গোল করেন। ম্যাচের সময় তখন ১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশেষ সময়ে করা জয়সূচক গোল।

মজার ব্যাপার হলো, ফুটবল আইন অনুযায়ী রেফারির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার মতো উপাদানও রয়েছে। ল’ ১২ অনুযায়ী, যদি কোনো খেলোয়াড় অসতর্কভাবে প্রতিপক্ষের পায়ে আঘাত করেন বা ট্যাকলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ফেলে দেন, তাহলে সেটি সরাসরি ফাউল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভিএআর কক্ষের কর্মকর্তারা সম্ভবত এই ব্যাখ্যাটিই অনুসরণ করেছেন।
কিন্তু ফুটবলে আইন আর অনুভূতি সব সময় এক জায়গায় দাঁড়ায় না। অনেক সাবেক খেলোয়াড়, বিশ্লেষক ও সমর্থকের কাছে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোর মনে হয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, নিয়মের দিক থেকে এটি সঠিক সিদ্ধান্ত।
বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া অবশ্য বিতর্কের চেয়ে তাঁর দলের মানসিক শক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ২–০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফেরা এবং শেষ পর্যন্ত জয় পাওয়াকে তিনি দলের চরিত্রের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে সেনেগালের কাছে এটি হয়ে থাকবে এক দুঃস্বপ্নের রাত। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা একটি দল শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। ম্যাচ শেষে লামিন কামারার কান্না, সতীর্থদের হতাশ মুখ আর গ্যালারিতে ভেঙে পড়া সমর্থকদের দৃশ্য হয়তো এই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ছবি হয়ে থাকবে।
আর সেই ছবির মাঝখানে থেকে যাবে একটি প্রশ্ন-
ওটা কি সত্যিই পেনাল্টি ছিল?
সিদ্ধান্তটি হয়তো বদলাবে না। কিন্তু বিতর্কটা বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ফুটবল বিশ্বে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।